ডিজিটাল বিবাহ-তালাক নিবন্ধন নিয়ে যা বললেন আইনমন্ত্রী
ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে জাল জন্মসনদ তৈরি করে বাল্যবিবাহ, অননুমোদিত বহুবিবাহ কিংবা বিয়ে সংক্রান্ত নানা ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস: বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্ম নিবন্ধন ডাটাবেজের সঙ্গে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থার সরাসরি আন্তঃসংযোগ থাকবে। ফলে একজন ব্যক্তির পরিচয় ও বয়সসহ প্রয়োজনীয় তথ্য এক ক্লিকেই যাচাই করা যাবে। এতে ভুয়া কাগজপত্র বা জাল জন্মসনদ ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে এবং প্রথম স্ত্রীর অজান্তে গোপনে বহুবিবাহের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মধ্যে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। আইন ও বিচার বিভাগের পক্ষে প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. আজিজুল হক এবং ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ) পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব এতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
আইন ও বিচার বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন উদ্যোগটির প্রথম ধাপে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে পাইলটিং ভিত্তিতে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।
পাইলট প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত উপজেলা হলো—গাজীপুরের কালিগঞ্জ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নড়াইল সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, সিলেট সদর, কক্সবাজারের চকরিয়া এবং কিশোরগঞ্জ সদর।
অনলাইন ব্যবস্থায় তথ্যের নিরাপত্তা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব তথ্য জাতীয় ডাটা সেন্টারে সংরক্ষিত থাকবে এবং ডাটার মূল নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের বৈবাহিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্র্যাকের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক লিগ্যাল এইড কর্মসূচি চালুর ফলে মামলা ফাইলিংয়ের চাপ কমার পাশাপাশি মানিকগঞ্জের মতো জেলায় বিকল্প উপায়ে ৫০ শতাংশ পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহ মডেলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে দ্রুত ডোপ টেস্ট ও বিচার প্রক্রিয়া চালুর ফলে বিচার ব্যবস্থায় মাদকের তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে কমে এসেছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, এনআইডি ও জন্মসনদ ডিজিটাল হওয়ায় পরিচয়সংক্রান্ত জালিয়াতি অনেকটাই কমেছে। তবে বিয়ের নিবন্ধন ব্যবস্থায় একই ধরনের ডিজিটাল সুবিধা না থাকায় নকল রেজিস্ট্রি ও ভুয়া সনদ ব্যবহার করে বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা এখনও ঘটছে।
তিনি বলেন, বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেজের ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন ও ক্রস-চেকিং চালু হলে এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিয়ের বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এনআইডি বা জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম নিবন্ধন সার্ভারের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা এবং পিছনের তারিখে বিয়ে নিবন্ধন বা ডুপ্লিকেট খাতা রাখার সঙ্গে জড়িত কাজীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের সফটওয়্যার তৈরির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ডাটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযুক্তির পাশাপাশি এতে পেমেন্ট গেটওয়েও যুক্ত করা হয়েছে।
নির্ধারিত এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারদের প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম শেষ করার পর আগামী ছয় মাসের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে এই প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা হবে। সমঝোতা স্মারকটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস. এম. এরশাদুল আলম, মো. খাদেম উল কায়েসসহ আইন ও বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ব্র্যাকের প্রতিনিধিরা।



























