রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০:২৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিট বন্ধ, উৎপাদন অর্ধেকে

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিট বন্ধ, উৎপাদন অর্ধেকে
ছবিঃ সংগৃহীত

‎যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাগেরহাটের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মধ্যে একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে এবং উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

‎রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাগেরহাটের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট হঠাৎ করে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের দায়িত্বশীল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অপ্রত্যাশিত বিভ্রাটের ঠিক আগমুহূর্তেও কেন্দ্রটি থেকে এক হাজার একশ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল, যা জাতীয় গ্রিডের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। কিন্তু একটিমাত্র ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্ল্যান্টটির সামগ্রিক উৎপাদন আকস্মিক ধস নেমে ছয়শ মেগাওয়াটের নিচে গিয়ে ঠেকেছে। ঠিক কী কারণে এবং কীভাবে দেশের অন্যতম বড় এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের একটি ইউনিট হুট করে এভাবে বসে পড়ল, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণ কাজের চরম অবহেলা নাকি যন্ত্রাংশের গুণগত মানে কোনো ঘাটতি ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ছুটির দিন কিংবা কর্মব্যস্ত সময়ের এই আকস্মিক ধাক্কা জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। নিয়মিত ওভারহোলিং ও ত্রুটি শনাক্তকরণের যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণেই মূলত এ ধরনের বড় বিপর্যয় বারবার ঘটে চলেছে বলে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফলে রামপালের এই উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং এটি বড় ধরনের সিস্টেমিক উইকনেস বা কাঠামোগত দুর্বলতার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

‎রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপ-মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটন করতে বর্তমানে প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরা মাঠে কাজ করছেন এবং ত্রুটি সারাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে প্রাথমিক মূল্যায়নের পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এই ত্রুটিপূর্ণ ইউনিটটি পুনরায় চালু করে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে অন্তত চার দিন সময় লেগে যেতে পারে। এই চার দিনব্যাপী উৎপাদনে ঘাটতি থাকার বিষয়টি জাতীয় গ্রিডের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

যদিও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে প্ল্যান্টটিতে বর্তমানে পর্যাপ্ত কয়লা মজুত রয়েছে এবং জ্বালানি সংকটের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেনি, তবুও একটি ইউনিট বন্ধ থাকার দরুন যে উৎপাদন শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কোনো উৎস থেকে পূরণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে যেকোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তা মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত ব্যাকআপ বা বিকল্প ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একটি ইউনিট নষ্ট হলেই পুরো সিস্টেমের অর্ಧেক সচল ক্ষমতা অচল হয়ে পড়ছে, যা প্ল্যান্টটির অপারেশনাল কার্যকারিতা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে তীব্র নেতিবাচক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ভুক্তভোগী মহল ও সাধারণ গ্রাহকরা মনে করছেন, এ ধরনের আকস্মিক বিভ্রাট রোধে নিয়মিত প্রাক-পরিদর্শন ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের লোডশেডিং বা জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

‎এই অপ্রত্যাশিত উৎপাদন হ্রাসের ফলে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা অবিলম্বে পূরণ না হলে সাধারণ জনজীবন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুম ও তীব্র গরমের এই সময়ে বিদ্যুতের ন্যূনতম ঘাটতিও জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছে দেয় এবং ক্ষুদ্র ও ভারী শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত করে অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে মন্থর করে তোলে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে এ ধরনের কারিগরি ত্রুটি পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা অপরিহার্য।

কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল দায়সারাগোছের বক্তব্য না দিয়ে কারিগরি ত্রুটির মূল উৎস কোথায় তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সেজন্য দক্ষ বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগ করা। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ খাতের এই ধরনের ভঙ্গুর দশা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা এবং প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সচল রাখা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, সামান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটির অজুহাতে দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই ধরনের বড় ধাক্কা বারবার সহ্য করতে হলে তা সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে এবং জনমনে সরকারের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়