বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৩৪, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৮ মাসে রাজধানীতে দাফন ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ

৮ মাসে রাজধানীতে দাফন ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে মিলছে অজ্ঞাত মরদেহ। কখনো খাল-ঝিলে, কখনো ফুটপাত কিংবা হাসপাতালের আশপাশে, আবার কখনো পরিত্যক্ত ভবন ও নির্জন স্থানে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে মরদেহ। কোনো কোনো মরদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকছে, আবার দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পচন ধরে মুছে যাচ্ছে পরিচয়ের শেষ চিহ্নও। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহটির মাথার অংশে পচন ধরে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। কপালেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, উদ্ধারের ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই কিশোরটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, মরদেহে পচন ধরে যাওয়ায় সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে পারেনি। কিশোরটির পরিচয় জানতে এলাকায় প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ তার বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি।

জুরাইনের ঘটনাটি একক কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের খবর এসেছে। তবে রাজধানীতে এ ধরনের মরদেহ উদ্ধারের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছরে অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।

তবে অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ একই বিষয় নয়। উদ্ধারের সময় কোনো মরদেহের পরিচয় জানা না থাকলে সেটিকে অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। এরপর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত এবং স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে তখন সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সত্কারের ব্যবস্থা করা হয়।

এ কারণে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাবকে রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া মোট অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

আঞ্জুমান তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সত্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি বেওয়ারিশ মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন বা সত্কার করেছে সংস্থাটি।

তবে এই সংখ্যাকে রাজধানীতে অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এতসংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহ থাকার বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আক্তার হোসেনও বলেছেন, বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না।

অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মরদেহ নতুন অবস্থায় উদ্ধার করা গেলে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোন, পোশাকসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন সামগ্রী থেকে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ মরদেহ পড়ে থাকলে পচন ধরে এসব আলামতের অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে আঙুলের ছাপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এবং স্বজনদের দেওয়া শারীরিক বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে প্রতিটি ঘটনায় এসব সূত্র পাওয়া যায় না।

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিচয়হীন মরদেহের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, পরিচয় শনাক্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করা প্রয়োজন।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়