বুধবার ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২

মোঃ কামরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:৪০, ২৪ মার্চ ২০২৬

এভিয়েশন ব্যবসায় অশনি সংকেত!

এভিয়েশন ব্যবসায় অশনি সংকেত!
ছবি: গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্য গত ১৬ দিনে দু’দফায় লিটারে ১০৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচলের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য দাড়ায় ২০২.২৯ টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশন (বিইআরসি) গত ৮ মার্চ প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা হয় নির্ধারণ করে, ঠিক ১৬ দিনের মাথায় তা আবার ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা।

ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট পরিচালনার জন্য গত ১৬ দিনে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ০.৬২৫৭ ডলার থেকে দু’দফায় বৃদ্ধি করে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করে বিপিসি।

জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটের জন্য শুল্ক ও মূসকসহ মূল্য নির্ধারণ করে থাকে বিপিসি এবং আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটের জন্য দেশী ও বিদেশী এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে শুল্ক ও মূসক ব্যতীত মূল্য নির্ধারিত হয়ে থাকে।

একটি এয়ারলাইন্সের যেকোনো রুটের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় জেট ফুয়েলে। গত ১৬ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি পায় ১১৫ শতাংশ। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এভিয়েশন ব্যবসা চরম সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।  

জেট ফুয়েলের মূল্য অতীতের সকল রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই রেকর্ড এর পরিসমাপ্তি ঘটবে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধিতে এভিয়েশন ব্যবসায় অশনীসংকেত দেখা যাচ্ছে। 
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রুটে জেট ফুয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারিত মূল্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কলকাতায় প্রতি লিটার ০.৬২ ডলার, মাস্কাটে ০.৬০৩ ডলার, দুবাইয়ে ০.৫৮৭ ডলার, জেদ্দায় ০.৫৮১ ডলার এবং দোহায় ০.৫৮৪ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে ব্যাংককে ১.০৯৮ ডলার, সিঙ্গাপুরে ০.৫৮৬ ডলার মূল্যে জেট ফুয়েল সরবরাহ করছে এয়ারলাইন্সগুলোকে। যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম মূল্যে।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক বেশি। বর্তমান অবস্থায় ভারত ও নেপালে মূল্য বৃদ্ধি অপরিবর্তীত রেখেছে, সেখানে পাকিস্তানে ২৪.৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮.৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ। সত্যিই সেলুকাস কি বিচিত্র আমার বাংলাদেশ!!

এয়ারলাইন্সকে টিকে থাকতে হলে কিংবা এভিয়েশন ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এয়ারলাইন্সগুলো তাদের বিভিন্ন রুটে ভাড়া বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো গতান্তর থাকবে না। ভাড়া বৃদ্ধি করলেই এ থেকে উত্তরন ঘটানো সম্ভব, তা কিন্তু নয়। ভাড়া বৃদ্ধির ফলে প্যাসেঞ্জার গ্রোথ হ্রাস পাবে, এটাই স্বাভাবিক।    

জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের এভিয়েশন খাতে নতুন এক চাপের বাস্তবতা তৈরি করেছে। জ্বালানি ব্যয় যেখানে একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন খরচের বড় অংশ, সেখানে এই হঠাৎ বৃদ্ধি পুরো শিল্পকে অস্থির করে তুলছে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম পুনঃনির্ধারণের ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য খরচ ব্যবস্থাপনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাত্রী ভাড়ার ওপর। টিকিটের দাম বাড়লে সাধারণ যাত্রীরা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হন, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটেই যাত্রী সংখ্যা কমে যেতে পারে। একইসঙ্গে এয়ারলাইন্সগুলো বাধ্য হচ্ছে কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমাতে বা বন্ধ করতে। ফলে দেশের আঞ্চলিক সংযোগ এবং পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, কার্গো খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে পণ্যের দামও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। ছোট ও নতুন এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন আকার ধারণ করবে, কারণ তাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত।

এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। জ্বালানির বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এভিয়েশন খাতকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নীতি প্রণয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে এয়ারলাইন্সগুলোকেও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, রুট পরিকল্পনায় কৌশলগত পরিবর্তন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও মনোযোগী হতে হবে।

সব মিলিয়ে, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়—এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র কার্যকর পথ।

বর্তমানের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেল প্রতি প্ল্যাটস রেট বৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়েছে।

জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য পুরো এভিয়েশন শিল্পের উপর চাপ সৃষ্টি করবে—যেখানে এয়ারলাইন্স, যাত্রী এবং সামগ্রিক অর্থনীতি সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হবে।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
ঢাকা পোস্ট