রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইমরানুল আজিম চৌধুরী

প্রকাশিত: ২১:১১, ১০ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটে দ্বিমুখী চিত্র: পাম্পে নেই তেল, অনলাইনে দেদারসে কালোবাজার

জ্বালানি সংকটে দ্বিমুখী চিত্র: পাম্পে নেই তেল, অনলাইনে দেদারসে কালোবাজার
ছবি: গ্রাফিক্স

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট যখন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য চোখে পড়ছে, যেখানে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও মিলছে না তেল, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা পাওয়া যাচ্ছে অনায়াসেই, তবে চড়া দামে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির সারি পাম্পের সামনে ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। কারও অপেক্ষা ৫ ঘণ্টা, কারও ৮ ঘণ্টা, তবুও শেষমেশ ফিরতে হচ্ছে খালি ট্যাংক নিয়েই। এই দৃশ্য যেন এক অনিশ্চিত প্রতীক্ষার প্রতীক, যেখানে সময় পুড়ছে, কিন্তু জ্বালানি মিলছে না।

কিন্তু এই সংকটের মধ্যেই অন্য এক বাস্তবতা উঁকি দিচ্ছে ডিজিটাল পরিসরে। ফেসবুক গ্রুপ ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বোতলভর্তি পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই লিটারপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। “ইনবক্স করুন”, “হোম ডেলিভারি অ্যাভেইলেবল” এমন প্রলোভনসঙ্কুল বার্তায় ভরপুর এসব পোস্ট, যেখানে সংকট যেন সুযোগে রূপ নিয়েছে।

একজন ভুক্তভোগী বাইকারের অভিজ্ঞতা এই দ্বৈত চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পাম্পে তেল না পেয়ে ফিরে আসার পর, বাধ্য হয়ে অনলাইনে কিনেছেন একই তেল, তাও প্রায় তিনগুণ দামে। প্রশ্ন উঠছে—তেল যদি না-ই থাকে, তবে এই সরবরাহ আসছে কোথা থেকে?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুই সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়; বরং এর পেছনে থাকতে পারে একটি সুসংগঠিত চক্র। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু পাম্পে দিনের নির্দিষ্ট সময়ের পর ইচ্ছাকৃতভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভেতরের কিছু অসাধু কর্মচারী গোপনে তেল সরিয়ে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তা বাজারে ছাড়ছেন। সেই তেলই পরে স্থান পাচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, বহুগুণ দামে।

এই চক্রে যুক্ত রয়েছে সংগ্রহ, মজুদ ও বিপণনের একটি অঘোষিত নেটওয়ার্ক—যেখানে নেই কোনো লাইসেন্স, নেই নিয়ন্ত্রণ, তবুও চলছে প্রকাশ্যে। প্লাস্টিক বোতল ও গ্যালনে সংরক্ষিত এই জ্বালানি শুধু অবৈধই নয়, বরং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এভাবে তেল সংরক্ষণে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি ভেজাল তেলের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং বিভিন্ন এলাকার তথ্য মিলিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এতে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—কেন এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি অবগত নয়, নাকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রয়েছে বড় ধরনের ফাঁক?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ভিত্তিতে অভিযান জোরদার করা, পাম্প পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন।

পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো শুধু জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছে না—তারা অপেক্ষা করছে একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার জন্য। এই অপেক্ষা যত দীর্ঘ হবে, ততই গভীর হবে অবিশ্বাসের ছায়া—আর ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে অদৃশ্য সেই কালোবাজার।

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়