শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:১২, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুই দশক ধরে পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয় পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া

দুই দশক ধরে পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয় পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া
ছবিঃ প্রতিনিধি

ভোরের আকাশে তখনও সূর্যের পুরোপুরি দেখা মেলেনি। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে নরম আলো। এরই মধ্যে নাজিরপাড়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে হাজারো পাখির কিচিরমিচির। ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গাছপালা। কোনো গাছের ডালে মায়ের ডাকে মুখ বাড়িয়ে আছে ছানা, কোথাও আবার দূর আকাশ পেরিয়ে খাবার নিয়ে ফেরা পাখির ব্যস্ততা। মনে হয়, সবুজের বুকজুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল পাখির সংসার।

পঞ্চগড়ের বোদা পৌর এলাকার নাজিরপাড়া গ্রামে প্রতিবছর এমনই দৃশ্যের দেখা মেলে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশি-পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে গ্রামটি। মানুষের ভালোবাসা, সহনশীলতা আর সচেতন পাহারায় এখানে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এক অনন্য অভয়ারণ্য।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিলের দিকে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাজার হাজার পাখি এসে জড়ো হয় নাজিরপাড়ায়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া সেলিমের বাড়ির ছাদে দাঁড়ালেই যেন চোখের সামনে খুলে যায় পাখিদের এক বিস্ময়কর জগৎ।

বাড়ির চারপাশের আম, জাম, নারিকেল, সুপারি, মেহগনিসহ নানা প্রজাতির গাছের ডালে ডালে ঝুলছে অসংখ্য বাসা। কোথাও শামুকখোল, কোথাও পানকৌড়ি, রাতচোরা, ঘুঘু, বকসহ নানা দেশি ও পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। তাদের মধ্যে শামুকখোলের উপস্থিতিই যেন আলাদা করে টানে মানুষের দৃষ্টি।

পাখিদের এই মিলনমেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটক, প্রকৃতিপ্রেমী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বছরের প্রায় ছয় থেকে সাত মাস নাজিরপাড়ায় বাসা বাঁধে পাখিরা, ডিম দেয়, ছানা ফোটায় এবং নতুন প্রজন্মকে উড়তে শেখায়। এরপর অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে আবার ডানা মেলে ফিরে যায় নিজেদের গন্তব্যে।

তবে পাখিদের এই আগমন গ্রামের মানুষের জন্য শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়, আছে কিছুটা বিড়ম্বনাও। হাজার হাজার পাখির বিষ্ঠায় বাড়ির উঠান, বারান্দা, বাঁশঝাড় ও রাস্তাঘাট নোংরা হয়ে যায়। কোথাও কোথাও ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ। কিন্তু প্রকৃতির এই অতিথিদের প্রতি ভালোবাসার কাছে সেই কষ্ট যেন তুচ্ছ।

দুই যুগ ধরে পাখিদের সঙ্গে সহাবস্থান করতে করতে নাজিরপাড়ার মানুষ এখন তাদের শুধু অতিথি হিসেবে দেখেন না, পরিবারেরই একজন মনে করেন।

পাখিদের নিরাপত্তায় গ্রামবাসীর রয়েছে নীরব পাহারা। স্থানীয় তরুণ ও সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে প্রতিহত করেন শিকারিদের। বাইরের কেউ পাখি শিকার কিংবা তাদের বাসা নষ্ট করার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেওয়া হয়। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগেই বছরের পর বছর নিরাপদে বংশবিস্তার করে আসছে পাখিরা।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বাইরে থেকে অনেকেই পাখি শিকার করতে আসে। আমরা তাদের বাধা দিই। পাখিগুলো এখন আর শুধু পাখি নয়, আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি নাজিরপাড়ায় এসে বাসা বাঁধে এবং বংশবিস্তার করে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন জানান, পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া, মহারাজার দিঘি, ময়দানদিঘিসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর পাখির আগমন ঘটে। পাখিদের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং শিকার ও নিষ্ঠুরতা বন্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নাজিরপাড়ার গল্প তাই কেবল পাখির আগমনের গল্প নয়। এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক নীরব সহমর্মিতার গল্প। যেখানে মানুষ নিজের উঠানের ময়লা, দুর্গন্ধ আর দৈনন্দিন অসুবিধাকে পাশে সরিয়ে প্রকৃতির অতিথিদের জন্য খুলে দিয়েছে নিরাপদ আকাশ।

পাখিরা প্রতিবছর আসে, সংসার গড়ে, ছানাদের ডানা মেলতে শেখায়, তারপর দূর অচিন গন্তব্যে ফিরে যায়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া কিচিরমিচিরে নাজিরপাড়ার মানুষ যেন প্রতি বছর নতুন করে শোনেন প্রকৃতির ভালোবাসার ভাষা।

জনপ্রিয়