রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৫৬, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৩ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি আকিজের!

২৩ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি আকিজের!
ছবি: সংগৃহীত

আকিজ গ্রুপের বিক্রি হয়ে যাওয়া সহযোগী প্রতিষ্ঠান ঢাকা টোব্যাকো চার অর্থবছরে ২৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূসক নিরীক্ষায় প্রথম কমিটি প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ফাঁকি নির্ধারণ করেছিল ২৩ হাজার ১৬৮ কোটি ১৯ লাখ ২৪৫ টাকা। যেখানে সুদ ছিল ১০ হাজার ৭৪৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। পরে প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় নিরীক্ষা কমিটি পুনরায় সুদ বাদে রাজস্ব ফাঁকির হিসাব দেয় ১০ হাজার ৭৯১ কোটি ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৯ টাকা। তাতেও নিরীক্ষা প্রতিবেদন মনঃপূত হয়নি আকিজ গ্রুপের। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির পুনরায় পর্যালোচনার নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনস্ত নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে। সে অনুযায়ী তৃতীয় কমিটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সুদসহ মাত্র ৩৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৮২৮ টাকা বকেয়া রাজস্ব নির্ধারণ করে।

এর ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আগের দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে। অবশ্য তৃতীয় কমিটি প্রতিবেদন দিলেও তিন প্রতিবেদনের মধ্যে কোনটির ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছে। তবে এনবিআর এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা দিয়েছে কি না তা জানা যায়নি। কারণ সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নির্দেশনা চেয়ে এনবিআরে প্রতিবেদন দেয় নিরীক্ষা অধিদপ্তর। এর দুই মাস পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ বশির উদ্দিন। অবশ্য দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই তিনি নানা কৌশলে এই তদন্তে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। এই প্রভাব বিস্তারের কারণেই কর ফাঁকির পরিমাণ ২৩ হাজার কোটি থেকে মাত্র তিনশ কোটিতে নেমে আসে বলে সূত্র দাবি করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা টোব্যাকোকে ২০১৭ সালের ৮ জুন নিরীক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনে নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়া হয় ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এতে চার অর্থবছরে মোট উদঘাটিত রাজস্ব ফাঁকি দেখানো হয় ২৩ হাজার ১৬৮ কোটি ১৯ লাখ ২৪৫ টাকা। প্রথম কমিটি মূসক দাখিলপত্রে উল্লেখ করা মোট উপকরণ ক্রয়মূল্য এবং সিএ রিপোর্টে উল্লেখ করা ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখতে পায়। ওই পার্থক্যের উপকরণ দিয়ে সর্বোচ্চ মূল্যস্তরের সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করা হয়েছে ধরে নিয়ে ফাঁকির হিসাব করা হয়। এ হিসাবে মূল ফাঁকি ছিল ১২ হাজার ২৬৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৫ টাকা। এর সঙ্গে প্রযোজ্য সুদ ১০ হাজার ৭৪৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ৮৬০ টাকা এবং স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ ৩৪ হাজার ৫২০ টাকা যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬৮ কোটি ১৯ লাখ ২৪৫ টাকা।

প্রথম কমিটির এ খসড়া প্রতিবেদনে আপত্তি জানায় আকিজ গ্রুপ। পরে ২০২১ সালের ১০ মার্চ পুনঃপর্যালোচনার জন্য দ্বিতীয় কমিটি গঠন করা হয়। দ্বিতীয় কমিটি ক্রয় হিসাব বইয়ে থাকা মোট উপকরণ, মূসক-১ অনুযায়ী ওই উপকরণ দিয়ে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের পরিমাণ এবং বিক্রয় হিসাব বইয়ে দেখানো উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় নেয়। কমিটি দেখতে পায়, ক্রয় হিসাব বইয়ে থাকা তামাকপাতা দিয়ে যত সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব, তার চেয়ে কম উৎপাদন দেখানো হয়েছে। এই পার্থক্যজনিত উপকরণ দিয়ে উৎপাদন করা সম্ভব এমন পণ্যের ভিত্তিতে ফাঁকির হিসাব করা হয়। সিগারেট উৎপাদনে ১২ থেকে ১৫ ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হলেও মূল উপকরণ তামাকপাতা হওয়ায় সেটিকেই হিসাবের ভিত্তি ধরা হয়। রপ্তানির পরিমাণ বাদ দিয়ে এবং নিম্ন মূল্যস্তরের সিগারেটের ভিত্তিতে হিসাব করে দ্বিতীয় কমিটি মূল ফাঁকি নির্ধারণ করে ১০ হাজার ৭৯১ কোটি ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৯ টাকা। রহস্যজনক কারণে সুদের হিসাবই করেনি এই কমিটি।

এরপরও দুটি প্রতিবেদনের তথ্যই সঠিক নয় দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন এনবিআর ও নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে পুনঃযাচাইয়ের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আগে দেওয়া তথ্যগুলো প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার থেকে প্রিন্ট করা হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল ইসলাম মনগড়া, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন। কারখানা ও ওয়্যারহাউসে সংরক্ষিত তামাকপাতার তথ্য পৃথকভাবে প্রদর্শন না করাসহ অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রেও মনগড়া তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য ছিল, এনবিআর অনুমোদিত মূসক সফটওয়্যারে থাকা তথ্যই সঠিক এবং সেটির ভিত্তিতেই নিরীক্ষা করা উচিত। আবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি জানার পর রুহুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সব তথ্য পর্যালোচনা করে তৃতীয় কমিটি সফটওয়্যারে ধারণকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বকেয়া রাজস্বের হিসাব করে। কমিটির নথিতে পরিহারকৃত সম্পূরক শুল্ক ও সুদ, পরিহারকৃত মূসক ও সুদ, অতিরিক্ত গৃহীত রেয়াত, ভবন ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর পরিহারকৃত মূসক ও সুদ এবং পরিহারকৃত উৎসে মূসকের বিভিন্ন হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। কমিটির হিসাবে দেখা যায়, মোট পরিহারকৃত রাজস্ব ১২৪ কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৭ টাকা এবং প্রযোজ্য সুদ ২১৯ কোটি ৩৫ লাখ ৮০ হাজার ৯৫১ টাকা। সুদসহ মোট বকেয়া রাজস্ব দেখানো হয় ৩৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৮২৮ টাকা। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সফটওয়্যার পরিদর্শন, ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে সংগৃহীত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোলের তথ্য, এসিটেট টো আমদানির তথ্য এবং ওয়্যারহাউসে তামাকপাতা সংরক্ষণের তথ্য যাচাই করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্যের সঠিকতা পাওয়া গেছে। সার্বিক পর্যালোচনায় সফটওয়্যারে ধারণকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই বকেয়া রাজস্বের হিসাব করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অব্যাহতিপাপ্ত সাবেক মহাব্যবস্থাপক রুহুল ইসলামের কাছ থেকেও লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তৃতীয় কমিটি। কমিটিকে তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে নিরীক্ষার জন্য দেওয়া হিসাব বিবরণী কখনও কখনও প্রমাণভিত্তিক ছিল না। সেগুলো বিক্ষিপ্তভাবে অথবা তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরে তিনি ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রয়োজনীয় দলিলপত্রসহ প্রমাণভিত্তিক হিসাব বিবরণী দাখিল করেছেন। যদিও আগের দুটি কমিটিকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়ার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করেননি তিনি।

নথির শেষাংশে নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগের দুই নিরীক্ষার হিসাব, বর্তমান কমিটির পুনঃযাচাই এবং সফটওয়্যার ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনায় নিরীক্ষা কার্যক্রম কীভাবে সম্পন্ন করা হবে সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা প্রয়োজন। এজন্য এনবিআরের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। তবে গত দুই বছরেও এনবিআর থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার এনবিআরে গিয়েও তা জানা যায়নি। 

সংস্থার চেয়ারম্যান আহসান হাবীবের ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে স্যার নয়, মূসক ইউনিট বলতে পারবে।’ কিন্তু মূসক নিরীক্ষার সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের দপ্তরে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি ঢাকার বাইরে আছেন বলে জানান তার পিএ। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

২৩ হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ বশির উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে গনমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। আমি একটা মিটিংয়ে আছি।’

সূত্র: প্রতিদিনের বালাদেশ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়