তোফাজ্জেল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে আসামিরা
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ছেলে মোঃ তোফাজ্জল (৩২) হত্যাকাণ্ডে নিভে গেছে একটি পরিবারের শেষ আশার আলো।
সরেজমিনে তোফাজ্জলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়—একসময় যেখানে ছিল একটি পূর্ণ পরিবার, আজ সেখানে স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নেই। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে তাদের বাড়িটি।
জানা যায়, ২০১১ সালের ১১ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তোফাজ্জলের বাবা মোঃ আব্দুর রহমান। এরপর ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তার মা।
পরিবারের আরেকটি বড় ধাক্কা আসে ২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল, যখন তোফাজ্জলের একমাত্র ভাই পুলিশের এসআই মোঃ নাসির লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
এরপর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে কিছু বিপথগামী শিক্ষার্থীর হাতে নিহত হন তোফাজ্জল। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবারের শেষ প্রদীপটিও নিভে যায়।
তোফাজ্জলের বাড়ির প্রতিবেশী এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ কবির, সাবেক ইউপি সদস্য কালা বৈরাগী, প্রতিবেশী মোঃ এমাদুলসহ এলাকাবাসী জানান, তোফাজ্জল ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী একজন তরুণ।
তিনি বরিশালের বিএম কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর মঠবাড়িয়া থানায় রাইটার হিসেবে কাজ করেন এবং পরে পাথরঘাটা থানায় দেড় বছর একই দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি চাকরির জন্যও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, তোফাজ্জল ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কাঠালতলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয়রা আরও জানান, কাঠালতলী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলামের মেয়ের সঙ্গে তোফাজ্জলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার।
একপর্যায়ে মেয়েকে তোফাজ্জলের কাছ থেকে দূরে সরাতে সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তোফাজ্জলকে বিভিন্ন সময় বেধড়কভাবে মারপিট করতো।
একদিকে পরিবার হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে প্রেমে ব্যর্থতা এবং শারীরিক নির্যাতনের চাপ—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তোফাজ্জল।
তবে মানসিক ভারসাম্য কিছুটা নষ্ট হলেও তিনি কখনো কারও ক্ষতি করেননি। এলাকাবাসী জানান, তিনি যেখানে যাকে পেতেন, শুধু খাবার চাইতেন এবং সবার সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতেন।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মোবাইল চুরির অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে কয়েকজন শিক্ষার্থী তোফাজ্জলকে আটক করে মারধর শুরু করে।
মারধরের একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ভাত খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর আবারও মারধর শুরু হয়। দফায় দফায় আঘাতের ফলে ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
এই ঘটনায় নিভে যায় একটি অসহায় পরিবারের শেষ প্রদীপ।
তোফাজ্জলের ভাইয়ের স্ত্রী শরীফা আক্তার জানান, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তোফাজ্জল তাকে ফোন করেন। তিনি বলেন, তাকে মোবাইল চুরির অভিযোগে হলে আটকে রাখা হয়েছে এবং টাকা দাবি করা হচ্ছে।
এরপর ওই নম্বর থেকে আবার ফোন করে তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। পরিচয় জানানোর পর তারা বলে, “তোফাজ্জলকে মোবাইল চুরির অভিযোগে আটকে রেখেছি, তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।”
শরীফা আক্তার বলেন, তিনি তাদের জানান যে তোফাজ্জলের মানসিক সমস্যা আছে এবং তিনি চোর নন। এরপর তারা দুই লাখ টাকা দাবি করে এবং টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
তিনি বলেন, “আমি তখন তোফাজ্জলের ঢাকায় থাকা মামা-চাচাদের ফোন নম্বর দিয়ে দিই। কিন্তু পরদিন শুনতে পাই ওরা তোফাজ্জলকে মেরেই ফেলেছে।”
তোফাজ্জেলকে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মারধর করে হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমানুল্লাহ শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতনামা একটি মামলা দায়ের করেন যার নম্বর ২৯।
মামলাটিতে শুরুতে নির্দিষ্ট কোনো আসামি উল্লেখ করা হয়নি, সবাইকে অজ্ঞাতনামা রাখা হয়েছিল।
তিনি জানান, মামলার তদন্ত শেষে শাহবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে ২১ জনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে এই মামলায় সাতজনকে গ্রেফতার করা হলে তারা দোষ স্বীকার করে এবং কারা কীভাবে আঘাত করেছে, কোথায় কী ঘটেছে এসব বিষয় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমানের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একের পর এক নারাজি পিটিশন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও পরে আরও সাতজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় মোট ২৮ জনকে আসামি করে ২০২৫ সালে ১৫ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা সহ কতিপয় আসামিদের রক্ষা করার লক্ষ্যে একের পর এক নারাজি পিটিশন দিতে থাকেন এক পর্যায় বর্তমান বছরের ১০ মার্চ আদালতকে আমরা অবগত করতে সক্ষম হলে আদালত তোফাজ্জল হত্যা মামলায় ২৮ আসামী অভিযুক্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।
তিনি আরও বলেন, আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তবে এতকিছুর পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসামিদের গ্রেফতারে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান বলেন, বর্তমানে মামলার সাতজন আসামি কারাগারে ছিলো, যাদের মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন। বাকি আসামিরা কারাগারে আছেন। পুলিশ ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামীদের গ্রেফতার করছে না।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে ভুক্তভোগী পরিবার। তাই তোফাজ্জেল হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া যেন বিলম্বিত না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয় এটাই তাদের দাবি।
সূত্র: জনকন্ঠ






















