নরসিংদী গণপূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ
ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসার বিরুদ্ধে
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসার বিরুদ্ধে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল প্রদান, টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে জালিয়াতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া একটি অভিযোগপত্রে এসব অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নরসিংদী জেলা কারাগারের একটি উন্নয়ন প্রকল্পে ডিপিপির আওতায় বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে কাজ পাইয়ে দেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা। অভিযোগ অনুযায়ী, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ বাস্তবায়ন ছাড়াই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ে ওই ঠিকাদারকে প্রায় ৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়। বিল পাওয়ার পর ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে গেলে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়ে। পরে কারা কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে প্রকল্পটির কার্যাদেশ বাতিল করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। বরং হিসাব শাখাকে চাপ দিয়ে ভুয়া বিল এন্ট্রি করানো হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, প্রকৃত অগ্রিম বিলের পরিমাণ ৫ কোটি নয়, প্রায় ১০ কোটি টাকা।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো ওই প্রকল্পের পূর্ববর্তী কাজের পরিমাপ ও আর্থিক নিষ্পত্তি সম্পন্ন না করেই অবশিষ্ট কাজের নতুন প্রাক্কলন অনুমোদনের চেষ্টা চলছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, এটি হলে একই কাজের বিপরীতে দ্বিতীয়বার বিল পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় হবে।
এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর থাকা স্থাপনার মূল্য নির্ধারণে জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে এ এস এম মুসার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট তৈরির নামে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আদায়ের পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজেও এলটিএম ও অন্যান্য টেন্ডার পদ্ধতি ব্যবহার করে সাজানো দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক টেন্ডারে মাত্র একটি, দুটি বা তিনটি দরপত্র দেখিয়ে মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে ৩০ থেকে ৩৫টি দরপত্র জমা পড়ার কথা বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত নরসিংদী জেলা কারাগার, জেলা জজ আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার জরুরি মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজেও আগে পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কাজ করিয়ে পরে ওটিএমের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বরাদ্দের বড় একটি অংশ কমিশন হিসেবে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ঢাকা-সিলেট ছয় লেন প্রকল্পের আওতায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা সদর হাসপাতালের প্রধান ফটক, বাউন্ডারি ওয়াল ও অভ্যন্তরীণ আরসিসি রাস্তা নির্মাণের কাজেও নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভোলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালেও এ এস এম মুসার বিরুদ্ধে এলটিএম ও ওটিএম টেন্ডারে অনিয়ম, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা এবং ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় স্থানীয় ঠিকাদারদের তীব্র প্রতিবাদের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নরসিংদীর কয়েকজন ঠিকাদার দাবি করেন, কমিশন ছাড়া কোনো কাজ পাওয়া যায় না এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত বিভাগে পদায়নের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন এ এস এম মুসা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ এস এম মুসার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



























