শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২৮, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সিপিডির ব্রিফিং

তথ্য গোপন করে টাকা ছাপিয়েছেন গভর্নর

তথ্য গোপন করে টাকা ছাপিয়েছেন গভর্নর
ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের  (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, টাকা ছাপানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার সংস্থা এটাকে কোনোভাবেই উৎসাহিত করে না।  

তিনি বলেন, ঘোষণা দিয়ে হোক বা গোপনে হোক, কোনোভাবেই টাকা ছাপানো ঠিক না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করেছেন টাকা না ছাপানোর জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপিয়ে তিনি সেটা গোপন রেখেছেন। পরে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থনীতি যে অবস্থায় পেয়েছিল, বর্তমান সরকার তার চেয়েও কিছুটা খারাপ অবস্থায় পেয়েছে। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।

বৃহস্পতিবার ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেওয়া নানা পদক্ষেপের সমালোচনা করে এসব কথা বলেছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। 

তিনি বলেন, বিগত সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপেও গত দেড় বছরে তা খুব বেশি কমেনি। গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই তিন দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছেন। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি না কমে বরং ঋণের সুদহার বেড়ে সর্বোচ্চ ১৬-১৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যা বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজার কিন্তু বুঝতে পারে যে টাকা ছাপানো হয়েছে কি না। কারণ টাকার বিপরীতে যদি পণ্য উৎপাদন না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি হতে বাধ্য। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ যদি অন্যতম লক্ষ্য হয়, তাহলে টাকা ছাপানোর চিন্তা যেন স্বপ্নেও না আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে গলদ ছিল বলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘস্থায়ী সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি তথা ১০ শতাংশ নীতি সুদহার বজায় রাখলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, গত ডিসেম্বরে যার পরিমাণ ৬ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। নীতি সুদহারের প্রভাবে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের অকার্যকর মুদ্রানীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। শুধু তা-ই নয়, বিনিময় হার জোর করে ধরে রেখেছেন গভর্নর। এর পরও রপ্তানি খাতে এই নীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গত ছয় মাসে রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমে সর্বশেষ ডিসেম্বরে ঋণাত্মক (-১৪.২৫) শতাংশে নেমে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে। এটা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।

এমন বাস্তবতায় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে নীতিতে চলছেন, তাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে নীতি সুদহার কমানোসহ একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব মুদ্রানীতি প্রত্যাশা করছি। যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ, নমনীয় তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে।’

সিপিডির মতে, ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে চারটি প্রধান খাতে নতুন সরকারকে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, সুদের হার কমানো। তৃতীয়ত, টাকার মূল্যমান কিছুটা কমানো এবং চতুর্থত, দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। যার সবগুলোই বাংলাদেশ ব্যাংককে করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এখন এক্সচেঞ্জ রেট বা ডলারের দর পুরোপুরি বাজারে ছেড়ে দেয় এবং বাজার থেকে ডলার কেনা বন্ধ করে তাহলে টাকার মান কিছুটা কমবে। তবে এটা খুব বড় ধরনের অবনমন হবে বলে মনে হয় না। সেই সঙ্গে খুব বড় ধরনের আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতিরও জন্ম দেবে না।

তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্সে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেটা কিছুটা কমিয়ে টাকার মূল্যমানকে আরও বাজারভিত্তিক করার মাধ্যমে যদি একটু অবনমন হয় তাহলে সেটা দিয়ে তাদের সেই ঘাটতিটা পূরণ হয়ে যাবে।

সূত্র: খবরের কাগজ