নতুন নোটের সংকট, বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত টাকা ছাড়তে হচ্ছে
গ্রাহকদের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নতুন ছাপানো নোটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যার ফলে ব্যাংকগুলোতে গেলেই মিলছে ছেঁড়া-ফাটা ও পুরোনো নোট, আর অধিকাংশ এটিএম বুথই হয়ে পড়েছে টাকাশূন্য। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের অনেকেই উদ্বেগ জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের স্বাক্ষর করা বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, চলমান এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে নতুন নকশার নোট ছাপানোর কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভায় পুরোনো নকশার নোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কার্যবিবরণীতে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। আবার এ নিয়ে বিস্তর কোনো আলোচনাও করা হয়নি। তবে দুয়েকদিনের মধ্যে এই নির্দেশনা টাকা ছাপানোর প্রতিষ্ঠান সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনকে জানানো হবে। এসব নোট এলে ছাপানো নোটের সংকট কিছুটা মেটানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির ঈদে ছাপানো টাকার চাহিদা অনেক বেড়েছিল। চাহিদা মেটাতে ঈদের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকশালের কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়। তবে টাকশাল দিতে পেরেছে অর্ধেকেরও কম। আবার ঈদের পর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংকটের কারণে টাকা উত্তোলন বেড়ে গেছে। মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়ে সংকট বেড়েছে। ঈদের পর শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে ছাপানো নোটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার একেবারে প্রস্তুত অবস্থায় থাকা ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ছাপানো নোট পড়ে আছে। এসব নোট আপাতত ছাড়া হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ঈদ উপলক্ষে নগদ অর্থের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং ঈদের পরপরই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা পরিশোধের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুদ্রা সাময়িকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের প্রবাহে সাময়িক চাপ পরিলক্ষিত হতে পারে। তবে এটি একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক পরিস্থিতি। ঈদ-পরবর্তী সময়ে অর্থ পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসার মাধ্যমে তারল্য ও মুদ্রা সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকের কোনো শাখা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি টাকা ভল্টে রাখতে পারে না। বেশি হলেই তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখায় জমা দেয়। আবার যখন দরকার হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাবের বিপরীতে উত্তোলন করে নিয়ে যায়। এভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা জমা ও উত্তোলন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। সব সময় ছেঁড়াফাটা, ক্রটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট ব্যাংকগুলোর কাছে এলে তা আলাদা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে থাকে। এ ধরনের নোট পুড়িয়ে ফেলে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমমূল্যের নতুন নোট দিয়ে থাকে। তবে চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন নকশা প্রণয়নসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরে নতুন নোট বাজারে আসছে না। বর্তমানে যেসব নোট রয়েছে তার বড় অংশই পুরোনো। সাধারণভাবে পুরোনো নোট এটিএম বুথে দেওয়া যায় না। ছাপানো নোটের সংকট আর তারল্য সংকট এক না। সব মিলিয়ে এখন সঞ্চয় রয়েছে ২৪ লাখ কোটি টাকার মতো। অথচ ছাপানো নোট রয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো।
ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্যমতে, বাজারে প্রচলিত ছাপা নোটের সিংহভাগই ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সাধারণ মানুষের হাতে থাকে। অন্যদিকে, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ব্যাংকগুলোর প্রায় ১২ হাজার শাখার ভল্টে সাধারণত ১৬ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জমা থাকে। এর বাইরে, ব্যাংকগুলোর সাথে দৈনিক লেনদেন সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্ট এবং সোনালী ব্যাংকের ‘চেস্ট’ শাখাগুলোতে থাকে আরও ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা।
স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, বাজার থেকে প্রতিনিয়ত পুরোনো, ছেঁড়া-ফাটা কিংবা মাত্রাতিরিক্ত ময়লাযুক্ত নোট তুলে নিয়ে তা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকে জমা দেওয়ার দায়িত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চাহিদামাফিক নতুন নোটের সরবরাহ না পাওয়ায়, বাধ্য হয়েই ব্যাংকগুলোকে এসব জরাজীর্ণ নোট বাজারে সচল রাখতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের হাতে এখন প্রচুর ছেঁড়া-ফাটা টাকা দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: সমকাল



























