বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:০২, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ইউজিসির নির্দেশনায় ইবির ২৬৮ অস্থায়ী কর্মচারী চাকরিচ্যুত

ইউজিসির নির্দেশনায় ইবির ২৬৮ অস্থায়ী কর্মচারী চাকরিচ্যুত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ২৬৮ অস্থায়ী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তারা ১০-২০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন।

থোক বরাদ্দ, দৈনিক মজুরি ও পোষ্য কোটায় নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী না করেই ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে টানা তিন মাসের বেতন বকেয়া থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তারা। চাকরিচ্যুতদের আশঙ্কা, তাদের শূন্য পদগুলোতে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে প্রশাসন বলছে, ইউজিসির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। শিগগিরই বকেয়া বেতন পরিশোধের আশ্বাসও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের প্রয়োজনের ভিত্তিতে অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। তাদের কেউ থোক বরাদ্দে, কেউ দৈনিক মজুরিতে এবং কেউ পোষ্য কোটার ভিত্তিতে কাজে যুক্ত হন।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল মিলিয়ে ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী থোক বরাদ্দের ভিত্তিতে নিয়োজিত। তাদের অধিকাংশই পোষ্য কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। অন্য প্রায় ২০০ জন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন। বর্তমানে এসব কর্মচারীর পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়।

তাদের বেতন ইউজিসির বিশেষ বরাদ্দ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিল থেকে পরিশোধ করা হতো। তবে বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ঋণ নিয়ে তাদের বেতন পরিশোধ করছে। বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব কর্মচারীর বেতন ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করেছে। সবশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিন্ডিকেটের অনুমোদনে নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের মাসিক বেতন ১০ হাজার এবং টেকনিক্যাল কর্মচারীদের ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে বেতন বৃদ্ধি ও চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও, অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন করেছেন এসব কর্মচারী। এ ছাড়া ৫৬ জন কর্মচারী চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। তাদের অভিযোগ, পোষ্য কোটায় নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের স্থায়ীভাবে নিয়োগের বিধান থাকলেও কাউকে স্থায়ী করা হয়নি।

কর্মচারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ১৯৬তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার স্ত্রী বা সন্তানদের যোগ্যতা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের দিকে একই প্রক্রিয়ায় পোষ্য কোটায় দুজনকে স্থায়ী নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে তাদের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। তাদের ভাষ্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে সামান্য বেতনে পরিবার নিয়ে এমনিতেই কষ্টে দিন কাটছে। এর মধ্যে চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা তাদের সংকট আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে ২০২০ সালের ইউজিসির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত এডহক, মাস্টাররোল ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরতদের বেতন বরাদ্দ অব্যাহত রাখা হবে এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া যুক্ত হওয়া কর্মচারীদের জন্য ইউজিসি কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখবে না। তবে কর্মচারীদের দাবি, ইউজিসির এ ধরনের নির্দেশনা আগে থাকলেও বিগত প্রশাসনগুলো তাদের বেতন বন্ধ করেনি।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীর জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া এবং তাদের আর না রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে ইউজিসি। ইউজিসির চিঠির ভিত্তিতে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তাদের বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি জনবল সংকটের বিষয়ে নতুন করে নোট দিতে বলেছে ইউজিসি। প্রশাসন সে অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তর চাইলে বর্তমানে কর্মরত এসব কর্মচারীকে কাজে রাখতে পারবে। সেক্ষেত্রে তাদের বেতনের দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরকেই বহন করতে হবে।

এ বিষয়ে কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ অন্তু বলেন, “দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি। অন্য কোথাও চাকরি করার মতো পরিস্থিতিও সবার নেই। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলবো, কোথায় যাব কিংবা কী পরিচয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াবো। পরিবার নিয়ে এখন আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।”

তিনি আরও বলেন, “তৎকালীন নীতিমালা অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে পোষ্য কোটায় আমাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু এখন সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের কথা বলে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ থেকে ২০ বছর কাজ করার পর এভাবে ছাঁটাই করা অমানবিক।”

ইমতিয়াজ আহমেদ অন্তু আরও বলেন, “আমাদের জায়গায় নতুন লোক নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ছাঁটাই করা হচ্ছে। সার্কুলারের মাধ্যমে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলে সেখানে আর্থিক লেনদেনের আশঙ্কাও রয়েছে। ইউজিসির ছাঁটাইসংক্রান্ত নির্দেশনাকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও প্রতিবছরই এ ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে আগের প্রশাসন আমাদের চাকরিচ্যুত করেনি।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “ইউজিসি এ খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকেই ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে, যার কারণে বকেয়া তৈরি হয়েছে।” তিনি বলেন, কর্মচারীদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, ইউজিসির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মচারীর বেতন দিতে প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এ অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে এ ব্যয় বহন করা কঠিন বলেও জানান তিনি।

জনপ্রিয়