জ্বালানি হাহাকারে দিশেহারা কুরিয়ার খাত: পচে যাচ্ছে পণ্য, গ্রাহকের ক্ষোভ আর মালিকের মাথায় হাত!
দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কুরিয়ার ও লজিস্টিক সেবা খাত। ডিপো থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় পণ্য পরিবহনের চাকা প্রায় থমকে গেছে। এর সরাসরি প্রভাবে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিকরা চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
পচছে গ্রাহকের পণ্য, বাড়ছে অসন্তোষ
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কুরিয়ার অফিসগুলোতে বর্তমানে পার্সেলের পাহাড় জমেছে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য যেমন—ফলমূল, শাকসবজি ও দেশীয় খাবার সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । অনলাইনে পণ্য বিক্রেতা অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অভিযোগ করেছেন, তাদের পাঠানো কয়েক হাজার টাকার পণ্য কুরিয়ার অফিসে আটকে পচে গেছে। গ্রাহকরা পণ্য হাতে না পেয়ে অর্ডার বাতিল করছেন, যার পুরো দায় ও লোকসান গিয়ে পড়ছে বিক্রেতার ওপর।
সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো
কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন এবং তেলের রেশনিংয়ের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেক গাড়িও রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না । অনেক সময় ফিলিং স্টেশনে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ২ থেকে ১০ লিটারের বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে না, যা দীর্ঘ দূরত্বের ভ্যানের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত । অনেক ছোট ও মাঝারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান তাদের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
কুরিয়ার সার্ভিস মালিকরা বলছেন, তারা উভয় সংকটে আছেন। তেলের জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল। তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় বা সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়াও আকাশচুম্বী। আগের চুক্তিতে বুকিং নেওয়া পার্সেলগুলো এখন দ্বিগুণ খরচে পাঠাতে গিয়ে লোকসানের ভারে নুয়ে পড়েছেন মালিকরা। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
গ্রাহকদের ভোগান্তি তুঙ্গে
জরুরি নথিপত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য—কিছুই সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, যেখানে দুই দিনে পণ্য পৌঁছানোর কথা, সেখানে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো হদিস মিলছে না। কুরিয়ার অফিসগুলোর কাস্টমার কেয়ারে কল করে কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা, ফলে তৈরি হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ।
সার্ভিস নয়, যেন এক অনিশ্চয়তার নাম
"গাড়ি ছাড়বে কি না জানি না, তেল পেলে খবর দেব"—কুরিয়ার অফিসগুলোতে গ্রাহকদের এখন এমন উত্তরই শুনতে হচ্ছে। জরুরি নথিপত্র, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কিংবা পরীক্ষার প্রবেশপত্র—কিছুই সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে না। গ্রাহক সেবা এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে এটি এক চরম ভোগান্তির নাম। অনেক গ্রাহক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন, "কুরিয়ার সার্ভিস এখন পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বদলে পণ্য নষ্ট করার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।"
সাপ্লাই চেইন যখন মৃত্যুর মুখে
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, কুরিয়ার সার্ভিস কেবল পণ্য টানে না, এটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বা 'সাপ্লাই চেইন'। এই চেইন একবার ভেঙে পড়লে এর প্রভাব থেকে বের হতে বছরের পর বছর সময় লাগবে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে পণ্যবাহী যানবাহনকে 'জরুরি সেবা' হিসেবে ঘোষণা না করলে এই খাত থেকে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামতে পারে। এতে শুধু লজিস্টিক খাত নয়, বরং পুরো দেশের ই-কমার্স এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক খাত দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে । দ্রুত তেলের রেশনিং ব্যবস্থা শিথিল করে পণ্যবাহী যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



























