যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা!
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না কানাডা। এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা খুবই কম হলেও, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঝুঁকিকেও বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে তিনি ‘চরম ঝুঁকি’ হিসেবে দেখছেন। তবে তার বিশ্বাস, এমন ঘটনা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কের দ্রুত অবনতিই অটোয়াকে এমন আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি কখনো কখনো বলপ্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের মধ্যে চলমান শুল্কযুদ্ধ এবং বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কানাডার দীর্ঘদিনের মার্কিন নির্ভরতা। এসব বিষয় দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রযুক্তি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও কৌশলগত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অংশীদার খুঁজছে কানাডা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বাড়িয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় অকল্পনীয়। তবে এমন সংঘাত শুরু হলে যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় খুব দ্রুতই শেষ হতে পারে। কানাডার সামরিক বাহিনীর তৈরি একটি মডেল বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালালে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ওই মডেল অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে কানাডা। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশটির সামরিক বাহিনীকে গেরিলা ধাঁচের কৌশলের আশ্রয় নিতে হতে পারে। পাশাপাশি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক সহায়তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও চাওয়া হতে পারে।
সম্ভাব্য এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কানাডা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে। সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাগরিকদের মধ্য থেকে তুলনামূলকভাবে স্বল্প প্রশিক্ষিত প্রায় ৩ লাখ সদস্য যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে কানাডায় সামরিক অভিযান পরিচালনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। এমন যুদ্ধে মার্কিন জনগণ এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর কাঙ্ক্ষিত সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে বলেও তাদের ধারণা।
তারপরও যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে শুরুতেই দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযান অনেকটা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ঝটিকা সামরিক অভিযানের মতো হতে পারে।
অবশ্য সম্ভাব্য সংঘাতের সূচনা সরাসরি সামরিক হামলার মাধ্যমে নাও হতে পারে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সাইবার হামলা কিংবা অন্য কোনো অপ্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা কতটা—তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। সম্ভাবনাটি যতই ক্ষীণ হোক, এমন একটি পরিস্থিতি মাথায় রেখে কানাডার সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এমন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়া বদলে যাওয়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি অশনি সংকেত।



























