বিদ্যুৎ খাতে পঞ্চ পান্ডবের লুণ্ঠন: খেসারত দিচ্ছে দেশবাসী
সারাদেশে তীব্র ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ে দিশেহারা জনজীবন। দেশজুড়ে বাড়ছে ক্ষোভ আর অসন্তোষ। কিন্তু এই অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনে বর্তমান সরকারের দায় কতটুকু? গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সংকটের মূল বীজ রোপণ করা হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে।
তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত 'পাঁচ লুটেরা' বা 'পঞ্চ পান্ডব' জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
মেগাওয়াটের গাণিতিক মায়াজাল ও বাস্তবতার ঘাটতি: কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯,০০০ মেগাওয়াট। যেখানে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহেও সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ১৮,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
সাধারণ হিসাবে দেশে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২,০০০ থেকে ১৪,০০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াটের বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিরও বেশি কেন্দ্র হয় পুরোপুরি বন্ধ, না হয় তাদের ক্ষমতার চেয়ে অনেক কমে চলছে। ক্যাপাসিটি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন করতে না পারাটাই বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
গ্যাস ও কয়লা সংকটে নিভেছে উৎপাদন আলো: দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসভিত্তিক, যা পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। গত পাঁচ বছরে দেশীয় গ্যাস কূপ খননে বিনিয়োগ না করে লাভজনক ‘ইমপোর্ট সিন্ডিকেট’ রক্ষায় জোর দেওয়া হয়েছিল এলএনজি আমাদানির ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও ডলার সংকটে বিদ্যুৎ খাত ধসে পড়ে।
অন্যদিকে, পায়রা ও রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো এবং বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় পর্যাপ্ত জ্বালানি কিনতে পারছে না। শুধু বেসরকারি কেন্দ্রগুলোরই সরকারের কাছে ১৬,৫০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আটকে আছে।
লুণ্ঠনের হাতিয়ার: কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ। এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় আইনি ফাঁদ ছিল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। কেন্দ্র বসিয়ে রাখলেও বিদ্যুৎ প্রস্তুত রাখার অজুহাতে সরকারকে মোটা অংকের অর্থ প্রদান বাধ্যবাধকতা করা হয়। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহীর পরিকল্পনায় আপদকালীন সমাধানের নামে বেসরকারি খাতের পথ খোলে। এরপর বিদ্যুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ ‘কুইক রেন্টাল’ প্রথা এবং বিচার বন্ধে ‘দায়মুক্তি আইন’ (ইনডেমনিটি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করেন। এর মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে লাইসেন্স তুলে দিয়ে দুর্নীতির অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়।
বিপুর পারিবারিক সাম্রাজ্য ও ১ লাখ কোটির হরিলুট : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ১০ বছরে এই খাতকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি লুণ্ঠন করেছেন তিনি। তাঁর ভাই, স্ত্রী, ছেলে ও মামাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে আড়াই হাজার কোটি টাকার এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প ১০০ ডলার মূলধনের ‘পাওয়ারকো’ নামের এক কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছিলেন। যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর মামা কামরুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘হামিদ গ্রুপ’। পরবর্তীতে কোনো দরপত্র ছাড়াই ভিটল, মারুবেনি ও পাওয়ারকো কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলারের কাজ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
প্রিপেইড মিটার ও সোলার প্রকল্পের মেগা দুর্নীতি: বিপুর ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু এবং সাবেক সেতুমন্ত্রীর ভাতিজা মিলে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট ডিপিডিসি, নেসকো ও আরইবি থেকে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার প্রি-পেইড মিটারিং ও আইটি প্রকল্প হাতিয়ে নেয়। এছাড়া গত দুই বছরে অনুমোদন পাওয়া ২৭টি সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দুটি পেয়েছেন বিপু’র ভাই অপু। একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে অন্তত ২০টি ধাপে তৎকালীন সিন্ডিকেটকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৬ দেশে বিপুর সম্পদের সাম্রাজ্য: লুণ্ঠিত টাকা দেশে না রেখে ‘ডলার’ ও ‘ইউরো’র মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো। দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মাল্টা, মালয়েশিয়া ও ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে বিপুর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ৪২ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি ও মোবাইল গ্যাস স্টেশন, দুবাইয়ে স্ত্রীর নামে ৩টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ছেলের নামে তালহা পাম বিচে বাংলো, মাল্টায় ক্যাসিনো এবং মালয়েশিয়ায় ৮৫০ কোটি টাকার রাবার ফ্যাক্টরির শেয়ার রয়েছে তাঁর পরিবারের নামে।
শেষ খলনায়ক ও অশুভ চক্রের সমাপ্তি
বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দিতে ভূমিকা রাখেন সাবেক বিদ্যুৎ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মগুলো ত্বরান্বিত করেন।
বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে কোনো টেকসই ও পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি; হয়েছে সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন। তৎকালীন সরকারের এই নীতিহীন পলিসি ও ‘পঞ্চ পান্ডবে’র পকেট ভরানোর খেসারত হিসেবেই আজকে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে বিষময় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে।



























