মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২:২৮, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী প্রত্যাহারের আহ্বান সিপিজের

সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী প্রত্যাহারের আহ্বান সিপিজের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে কোনো প্রতিবেদনকে ‘যাচাইহীন’ বা ‘অযাচাইকৃত’ মনে করলেই কর্মকর্তারা সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করা এবং সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিলের মতো ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো এতটাই বিস্তৃত যে এগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংগৃহীত ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করতে সক্ষম হতে হবে। এমন তথ্যও প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে, যা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেনি।

সিপিজে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইনে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে নতুন ফৌজদারি বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কোনো তথ্য বা প্রতিবেদনকে কর্তৃপক্ষ ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে বিবেচনা করলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের অপরাধের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

সিপিজের মতে, কোনো সংবাদ বা তথ্যকে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রাখা হলে তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সংগঠনটির বক্তব্য, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাংবাদিকের। কিন্তু কোনো তথ্য সরকারের অনুমোদিত নয় বলেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নয়, সংবাদমাধ্যমের ওপরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিজে।

কোনো সংবাদমাধ্যমকে আইনের আওতায় অপরাধী সাব্যস্ত করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা নিবন্ধন স্থগিত কিংবা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

সিপিজের মতে, সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করা বা নিবন্ধন বাতিলের মতো ব্যবস্থা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সিপিজে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নির্বাচিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে একটি পরামর্শ সভা করেছে।

সংগঠনটি বাংলাদেশের সাইবার অপরাধসংক্রান্ত আইন অতীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ঘটনাগুলোর কথাও উল্লেখ করেছে। সিপিজের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৎকালীন সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অন্তত ২৫৫ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

সংগঠনটির আশঙ্কা, ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে প্রণীত নতুন বিধানও যাতে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে একই ধরনের চাপ বা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালীব রহমান বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করাই প্রস্তাবিত সংশোধনীর উদ্দেশ্য।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বিধানকে মূলত অনলাইনে গুজব, ভুল তথ্য ও সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তবে সিপিজের বক্তব্য, ভুল তথ্য মোকাবিলার নামে এমন কোনো বিধান করা উচিত নয়, যার ফলে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করা সাংবাদিকরাও ফৌজদারি মামলার ঝুঁকিতে পড়েন।

প্রস্তাবিত সংশোধনী ঘিরে মূল প্রশ্ন হলো—কোনো তথ্য সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং ‘অযাচাইকৃত’ তথ্যের সংজ্ঞা কী হবে?

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনেক সময় সরকারি কোনো নথি বা বক্তব্য প্রকাশের আগেই সাংবাদিকরা বিভিন্ন স্বাধীন উৎস, নথি, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক হয়ে গেলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে সিপিজে সরকারকে প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়