৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩, মব সহিংসতায় ১৮৭
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৮৭ জনের। এ ছাড়া কারাগারে ৯৫ জন বন্দীর মৃত্যু এবং ৫১৮ জন সাংবাদিকের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত সংগঠনটির জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৯০ জন।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের আটজন এবং আওয়ামী লীগের ছয়জন রয়েছেন। বাকি ১২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় অজানা অথবা তাঁরা অন্যান্য দলের সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রমিকের মৃত্যু
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে।
একই সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৫ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৬৩ জন। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সীমান্ত পরিস্থিতি
প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা এবং ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে অন্তত একটি গুম এবং একজনকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও সভা-সমাবেশে বাধা
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনায় ২৯৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৮৭ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত, ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ২০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ৫৮টি ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে।
মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।



























