শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট

প্রকাশিত: ০০:৫০, ১৯ জুন ২০২৬

‎সুন্দরবনের নিরাপত্তা সুসংহত করতে কোস্ট গার্ডের কঠোর হুঁশিয়ারি ও অভিযানের নতুন মাত্রা

‎সুন্দরবনের নিরাপত্তা সুসংহত করতে কোস্ট গার্ডের কঠোর হুঁশিয়ারি ও অভিযানের নতুন মাত্রা
ছবি: প্রতিনিধি

‎সুন্দরবনে বনদস্যুতা নির্মূলে কোস্ট গার্ডের চলমান বিশেষ অভিযান এবং কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে বাহিনীর মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক অপরাধীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

‎সুন্দরবনে দস্যুতা দমন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোস্ট গার্ড বর্তমানে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে বাহিনীর মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক জানান, বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় সুন্দরবনে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও বনদস্যুতা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে কোস্ট গার্ড ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামক দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে দস্যু চক্রগুলো বর্তমানে চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন ও তার সহযোগীদের আত্মসমর্পণ সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলে জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাহিনীর সক্ষমতাকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

‎দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলো বনদস্যুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, বিশেষ করে মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকাটি দস্যুদের লজিস্টিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এই সমস্যা সমাধানে কোস্ট গার্ড স্টেশন হারবারিয়া স্থাপনের মাধ্যমে দস্যুদের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহের পথ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই স্টেশনে দুর্বৃত্তদের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক প্রকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জেলেদের ভাষ্যমতে, দস্যুদের দৌরাত্ম্য কমলেও মাঝে মাঝে এই ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা মনে করছেন, কোস্ট গার্ডের এই কঠোর অবস্থানের ফলে অপরাধীদের আয়ের পথ সংকুচিত হওয়ায় তারা মরিয়া হয়ে এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎স্টেশন হারবাড়িয়ায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, এটি কেবল সরকারি সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং সুন্দরবনের নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। ঘটনার পরপরই কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন। সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য ১৬১১১ নম্বরে জানানোর জন্য সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা অপরাধ দমনে স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা ও সচেতনতাকে আরও বৃদ্ধি করবে বলে আশা করছে প্রশাসন।

‎সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ও বিশাল বনাঞ্চলে অপরাধীদের মূলোৎপাটন করা একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হলেও কোস্ট গার্ডের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান সামগ্রিক পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্টেশন হারবাড়িয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ দেয়াল হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কোস্ট গার্ডের এই কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত টহল অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় অর্থনীতি ও জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয়