কাজী ফার্মসে শ্রমিক অসন্তোষ, বন্ধ উৎপাদন
ফিডমিলের মেশিন থেমে গেছে। নীরব হয়ে আছে কর্মচঞ্চল প্রাঙ্গণ। ফটকে ঝুলছে তালা। অথচ তালাবদ্ধ সেই ফটকের ওপারে নয়, এপারে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মানুষের অনিশ্চিত আগামী।
যে হাতগুলো প্রতিদিন মেশিনের শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবিকার চাকা ঘোরাত, আজ সেই হাতেই হিসাব, "আগামী দিনের ভাত আসবে কোথা থেকে?"
পঞ্চগড়ের বোদায় কাজী ফার্মসের ফিডমিলে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় শ্রমিক এবং এলাকাবাসী কারখানার সামনে মহাসড়ক অবরোধ করে হারানো চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে উৎপাদন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কয়েকজন দৈনিক মজুরকে কোনো কারণ না জানিয়ে মৌখিকভাবে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়। কাজ হারানোর সেই ক্ষত থেকেই ধীরে ধীরে জমে ওঠে ক্ষোভ; একপর্যায়ে তা ছড়িয়ে পড়ে কারখানার ফটকের বাইরে।
কাজ হারানো সাত শ্রমিকের মধ্যে রয়েছেন আসাদুল আসাদ, মো. তানিন হোসেন, রাবিউল ইসলাম, মো. রুবেল ইসলাম, বেলাল হোসেন, মো. আলম ও মো. কাদের।
শ্রমিকদের কথায়, এটি কোনো রাজনৈতিক মিছিল ছিল না, ছিল জীবিকার তাগিদে মানুষের সমবেত হওয়া। তাদের হাতে ছিল না কোনো রাজনৈতিক পতাকা; ছিল কাজ হারানোর শঙ্কা। তাদের মুখে ছিল না কোনো দলীয় স্লোগান, ছিল সংসার চালানোর প্রশ্ন।
দিনের শেষে যে মজুরির কয়েকটি টাকা হাতে নিয়ে তারা ঘরে ফিরতেন, সেই টাকাতেই কারও ঘরে বাজার হতো, কারও সন্তানের খাতা-কলম আসত, কারও বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ। সেই সামান্য আয়ের পথটুকু বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাদের ক্ষোভের আগুনকে উসকে দিয়েছে বলে দাবি শ্রমিকদের।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় ব্যবস্থাপনার কাছে নিজেদের সমস্যার কথা জানালেও কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে কাজী ফার্মসের দাবি, গত ছয় মাসে ওই ফিডমিলে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, সেখানে বর্তমানে ৩৭০ জন শ্রমিক কাজ করছেন; এর মধ্যে ১৩৫ জন পঞ্চগড়ের বাসিন্দা।
উত্তেজনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বোদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ও সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। তাদের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে পরিস্থিতি বড় ধরনের সংঘাতে গড়ানোর আগেই নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনার পরদিন কাজী ফার্মসের প্রধান কার্যালয় থেকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে পুরো বিষয়টি পরিদর্শন করেন। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন, কাজ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ করা শ্রমিকদের তালিকা সংগ্রহ করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তথ্য নেন।
এদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু কারখানার ভেতরেই থেমে নেই ক্ষতির হিসাব। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দৈনিক মজুরির শ্রমিকরা। ফিডমিলের আশপাশের ছোট দোকানগুলোর বেচাকেনাতেও পড়েছে তার ছায়া।
এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্নভাবে আলোচনায় এলেও শ্রমিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা: কাজ হারানোর ভয়, জীবিকা হারানোর শঙ্কা এবং নিজেদের কর্মসংস্থানের দাবি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, কাজের দাবিতেই কারখানার সামনে এসেছিলেন।
কারখানার দেয়াল হয়তো আজ নীরব। মেশিনও থেমে আছে। কিন্তু ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকের চোখে যে প্রশ্নঃ ‘কাজটা কি আবার পাব?’ - তার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই নীরবতা পূর্ণ নীরবতা নয়।



























