শুক্রবার ২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২

‎আবু হানিফ, বাকৃবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪:৫৪, ২০ মার্চ ২০২৬

‎‎বাকৃবিয়ানদের ঈদ ভাবনা ও এক চিলতে নস্টালজিয়া, সঙ্গে ঈদ সালামির উন্মাদনা

‎‎বাকৃবিয়ানদের ঈদ ভাবনা ও এক চিলতে নস্টালজিয়া, সঙ্গে ঈদ সালামির উন্মাদনা
ছবি: সংগৃহীত

‎ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘেরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাস এখন নিঝুম ও শান্ত। চিরচেনা সেই কেআর মার্কেটে আড্ডা নেই, নেই লাইব্রেরি অভিমুখে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণা। 

হলের ডাইনিংয়ের সেই পাতলা ডাল আর প্র্যাকটিক্যাল লেখার পাহাড় ডিঙিয়ে যখন ঈদের ছুটির ঘণ্টা বাজে, তখন শিক্ষার্থীদের মনে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা কাজ করে। এবারের ব্যাকুলতা আরো অন্যরকম, কারণ হুট করে একদিনের সরকারি নোটিশেই ছুটির সুসংবাদটা পেয়েছে সবাই। কৃষিবিদ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যারা সারা বছর কাদা-মাটি আর ফিল্ড ওয়ার্কে ডুবে থাকে, তাদের কাছে ঈদ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের ছুটি নয়, বরং যান্ত্রিক জীবন থেকে এক টুকরো প্রশান্তি।

‎ঈদ সালামির মহোৎসব:

‎বাকৃবি ক্যাম্পাসের ঈদের আনন্দ শুরু হয় আসলে বাড়ি ফেরার কয়েক দিন আগে থেকেই। বড় ভাই বা আপুদের দেখলেই তখন জুনিয়রদের কপালে ভক্তি উপচে পড়ে। লক্ষ্য একটাই সালামি। 

কৃষি অর্থনীতি অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফরহাদ বলেন বাকৃবির ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ঈদের সালামি আদায়। 

জুনিয়ররা সিনিয়রদের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার জন্য মেতে ওঠে এক মজার প্রতিযোগিতায়। রামাদানে টানা প্রায় ২০-২২ দিন ক্লাস করে হাহুতাশ করা শিক্ষার্থীরাও ছুটির নোটিশ পেলেই, বাড়ি যাওয়ার যত তাড়াই থাকুক না কেন, সালামির জন্য সিনিয়রদের ধরতে ভোলে না। শুরু হয়ে যায় সালামি আদায়ের এক অন্যরকম “যুদ্ধ”।

কোনো সিনিয়র হয়তো ক্যাম্পাসেই চুপিচুপি সালামি দিয়ে দেয়, এই সালামিকে ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য মজার ঘটনা। আবার কেউ কেউ একদম নাছোড়বান্দা—তাদের কাছ থেকে সালামি আদায় করতে হলে করতে হবে বেশ স্ট্রাগল! সালামি পেতে অপেক্ষা করতে হয় চাঁদ রাত পর্যন্ত, মাধ্যম বিকাশ। আবার কারো ভাগ্যে জোটে ১০ টাকা ২০ টাকা।

‎টাকার অংক যাই হোক না কেন, এই সালামিকে ঘিরে জুনিয়র ও সিনিয়রদের মাঝে তৈরি হয় এক অন্যরকম সুন্দর বন্ধন। এই যে সামান্য ১০-২০ টাকার জন্য বড় ভাইদের পিছে লেগে থাকা, এটাই তো ক্যাম্পাসের অকৃত্রিম ভালোবাসা।"

‎এলাকায় 'বিশেষজ্ঞ' বিড়ম্বনা:

‎ট্রেনের টিকিট যুদ্ধ শেষ করে যখন একজন বাকৃবিয়ান বাড়ি পৌঁছায়, তার অবস্থা হয় অনেকটা পাড়ার সেলিব্রেটির মতো। তবে এই সেলিব্রেটি ভাবটা বেশিক্ষণ টেকে না যখন পাড়ার মানুষের বিচিত্র সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ভেটেরিনারি অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তৌফিক তার মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, "বাড়ি যাওয়ার পরদিন সকালেই পাড়ায় হাঁটতে বেরোলে এক চাচা তার গরু দেখিয়ে বলে, গরু নাকি ঠিকমতো ঘাস খাচ্ছে না, সেটা নাকি আমাকেই সমাধান করতে হবে। 

আমি তো অবাক! আমি উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি তো মাত্র পড়া শুরু করেছি, কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। উনার ধারণা, বাকৃবিতে পা রাখা মানেই আমি আস্ত এক পশু চিকিৎসক হয়ে গেছি!"

‎একই বিড়ম্বনার শিকার কৃষি প্রকৌশল অনুষদের তৌহিদ, তাকে পাশের বাড়ির দাদু ডেকে বললেন তার পানি সেচের ডিপ মেশিনটা কেন স্টার্ট নিচ্ছে না তা দেখে দিতে। তার ভাষায়, "মানুষ ভাবে আমরা ক্যাম্পাসে গিয়েই সব যন্ত্রপাতির নাড়িভুঁড়ি জেনে ফেলেছি। তবে এই যে মানুষের অগাধ বিশ্বাস, এটা যেমন মাঝে মাঝে বিড়ম্বনার, তেমনি আমাদের ভবিষ্যতের বড় দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়।"

‎মানবিক ঈদ ও শুদ্ধ আনন্দ:

‎শুধু আনন্দ আর আড্ডাই নয়, বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনায় উঠে আসে গভীর জীবনদর্শনও।  সব অনুষদের শিক্ষার্থীদের একটাই চাওয়া- ঈদ হোক বৈষম্যহীন। 

কৃষি অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু উবাইদা বলেন, ঈদ মানে শুধু নিজের নতুন পোশাক বা সুস্বাদু খাবার নয়। তার মতে, "আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের কাছে ঈদের দিনটিও সাধারণ দিনের মতো। সেই এতিম বা অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়াতে না পারলে ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ  থেকে যায়। 

তাই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের সালামির একটা অংশ দিয়ে পাড়ার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করব।

‎কৃষি অর্থনীতি অনুষদের শাকিল মনে করেন,  উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা ক্ষতিকর আতশবাজি ফুটিয়ে অন্যকে কষ্ট দেওয়া ঈদের শিক্ষা নয়। আকাশের পাখির ক্ষতি করে কিংবা অসুস্থ মানুষের ঘুম হারাম করে যে আনন্দ, তা কখনো প্রকৃত উৎসব হতে পারে না। অতিরিক্ত অপব্যয় বর্জন করে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং ত্যাগের মাঝেই লুকিয়ে আছে ঈদের প্রকৃত সার্থকতা।

‎ঈদ মানে ফিরে পাওয়া শৈশব:

‎কৃষি অনুষদের নুসরাত তাহমিনা ভূঁইয়ার কাছে ঈদ মানে ফিরে পাওয়া শৈশব। তিনি বলেন অনেক বছর পর এবার যেন এক অন্যরকম ঈদ উপহার পেলাম—মাথার ওপর নেই কোনো পরীক্ষার বোঝা, নেই কোনো অ্যাসাইনমেন্টের টেনশন!

‎বাকৃবিতে সাধারণত ঈদের ছুটি মানেই যেন এক ঝটকায় শেষ হয়ে যাওয়া কিছু দিন। এবার তো খোদ শিক্ষকরাই অবাক হয়ে বললেন, "টানা ২০ দিনের ছুটি আমরাও বোধহয় আগে পাইনি!" তাই আমার জন্য এই আনন্দটা একদম দ্বিগুন!

‎বাসায় ফেরার পর থেকেই চারদিকে যেন উৎসবের আমেজ। অনেকদিন পর পুরনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা, আত্মীয়স্বজনের বাসায় যাওয়া, আর স্কুল-কলেজের সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণে ইফতার আড্ডায় অংশ নেওয়া—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে ঠিক যেন ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছি। সেই একই চঞ্চলতা, একই উত্তেজনা!

‎কৃষি অনুষদের আরেক শিক্ষার্থী তাকি মনে করেন, নতুন জামা আর সুগন্ধির চেয়েও বড় হলো পারস্পরিক ভালোবাসা। "ঈদের নামাজ শেষে যখন সবাই মিলে আল্লাহর শোকরিয়া জানাই, তখন সারা বছরের সব ক্লান্তি মুছে যায়।" কৃষি অর্থনীতি অনুষদের রুহুল আমিন  এবং রাফিউলের কণ্ঠে সেই একই মানবিক আহ্বানের সুর ফুটে ওঠেছে। ঈদ মানে সহমর্মিতা, ঈদ মানে ভালোবাসা বিলিয়ে দেওয়া।

‎ছুটি শেষে যখন আমরা আবার ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে সেই চিরচেনা হলে ফিরব, আমাদের ব্যাগে থাকবে মায়ের হাতে বানানো সুস্বাদু খাবার আর হৃদয়ে থাকবে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের মধুর স্মৃতি। বাকৃবি শিক্ষার্থীদের এই ঈদ ভাবনা আসলে এক মিশ্র অনুভূতি—যেখানে মিশে আছে ১০ টাকার সালামির নির্ভেজাল আনন্দ, এলাকার মানুষের কৌতূহলী বিশ্বাস এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার।

দূর-দূরান্ত থেকে যখন সবাই আবার ক্যাম্পাসে জড়ো হবে, তখন আবার চাঙা হয়ে উঠবে জব্বারের মোড়, কেআর মার্কেট।