পদোন্নতির প্রলোভনে ধর্ষণ, ৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক কাজী শাহরিয়ার বিন শামসের বিরুদ্ধে এক খণ্ডকালীন নারী শিক্ষককে চাকরি স্থায়ীকরণের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ এবং প্রায় ৪ রাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষিকার দাবি, ঘটনার বিচার না করে উল্টো তাঁকেই কলেজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক শামীমা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ওই খণ্ডকালীন প্রভাষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘একাডেমিক কার্যক্রমে আর প্রয়োজন না থাকায়’ তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগী শিক্ষিকার অভিযোগ, বিষয়টির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করেই তাঁকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক কাজী শাহরিয়ার বিন শামস এবং তাঁর সহকর্মী ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, জামায়াত নেতা ও কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য আবু জাফর মোহাম্মদ কামাল উদ্দীনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকার ভাষ্য, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি তেজগাঁও কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন একই পদে থাকায় পদোন্নতির জন্য তিনি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে তাঁর সঙ্গে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক কাজী শাহরিয়ার বিন শামসের পরিচয় হয়।
পদোন্নতির বিষয়ে কাজী শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বললে তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে দাবি ওই শিক্ষিকার। এরপর তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে এবং তাঁরা কয়েকবার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে সময় কাটান।
ভুক্তভোগী বলেন, এই ঘোরাফেরার মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষক কাজী শাহরিয়ার বিন শামস বিভিন্ন সময় তাঁকে বাজে ইশারা করতেন। একপর্যায়ে তিনি তাঁকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করেন। অভিযুক্ত কাজী শামস ওই শিক্ষিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে মাথায় কোরআন শরীফ নিয়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরপর অভিযুক্ত শামস আরও একাধিকবার ওই শিক্ষিকাকে ধর্ষণ করেন।
ওই শিক্ষিকা আরও বলেন, তিনি যখনই কাজী শামসকে পদোন্নতির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, তিনি ‘হায়ার অথরিটিকে জানিয়েছেন’, ‘আর অল্প সময় লাগবে’ বলে আশ্বস্ত করতেন। এরমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষক ভুক্তভোগী শিক্ষিকাকে একদিন জানান যে, তাঁর পদোন্নতির জন্য ৩ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা লাগবে। ভুক্তভোগী শিক্ষিকা তাঁর কথা অনুযায়ী তাঁকে ৩ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করেন। তবে, টাকা দেওয়ার বিনিময়ে প্রমাণস্বরূপ ডকুমেন্ট চাইলে কাজী শামস তাঁকে নিজ নামে থাকা জমির দলিলের কপি প্রদান করেন এবং কলেজে আসলে ‘প্রতিদিন তো দেখা হবেই, ডকুমেন্ট লাগবে কেন’ বলে আশ্বস্ত করেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকা জানান, এসব ঘটনা চলার মধ্যেই কাজী শামসের স্ত্রী ও পরিবার বিষয়টি আঁচ করতে পারেন এবং শামসের স্ত্রী একাধিকবার কলেজে এসে কলেজ প্রশাসন ও সহযোগী অধ্যাপক, জামায়াত নেতা এবং কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য আবু জাফর মোহাম্মদ কামাল উদ্দীনের কাছে বিচার দেন। তারই প্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি মিমাংসার উদ্দেশে কলেজ প্রশাসন মিটিংয়ে বসে। তবে, সে মিটিংয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষিকা ও অভিযুক্ত শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন না। পরে মিটিংয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভুক্তভোগী শিক্ষিকাকে কলেজ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকা বলেন, তিনি কেবল পদোন্নতির জন্যই বিশ্বাস করে তাঁকে টাকা দিয়েছিলেন। বিনিময়ে আজ চাকরি হারাতে হলো। তিনি বলেন, ‘যদি শাস্তি হয় তাহলে তো দুজনেরই হবে। আমাকে একা কেন শাস্তি দেওয়া হলো?’
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক কাজী শাহরিয়ার বিন শামস বলেন, ‘আমরা কাজিন। একত্রে বসে চা-কফি খেয়েছি। পদোন্নতির বিষয়ে টাকা-পয়সা লাগে। এটাতো সবাই জানে। আমি তাঁকে টাকার কথা বলেছি। তবে, আমি এখন পর্যন্ত কোনো টাকা নেইনি।’
শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রথমে তিনি অস্বীকার করলেও পরে ভুক্তোভোগী শিক্ষিকার তোলা ব্যক্তিগত সময়ের ছবি ও ব্যক্তিগত মেসেজ আদান-প্রদানের একাধিক স্কিনশর্ট দেখানো হলে তিনি বলেন, ‘আমার ফোন হ্যাক হয়েছিল।’ পাশাপাশি ছবিগুলো ‘এডিটিং’ করে তাঁকে ফাসানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে, ওই শিক্ষিকাকে কোরআন শরীফ মাথায় নিয়ে বিয়ের বিষয়ে আশ্বস্ত করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।
এছাড়া, তাঁর স্ত্রী কলেজে এসে কখনোই বিচার দেয়নি বলে জানান তিনি। তবে, প্রতিবেদক বিভাগটির একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে যে, কাজী শামসের স্ত্রী বেশ কয়েকবার কলেজে এসেছেন, ঘটনার বিষয়ে গভর্নিং বডির সদস্য আ জ ম কামাল উদ্দীন ও অধ্যক্ষকে বিচার দিয়েছেন।
তবে, এ বিষয়ে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও জামায়াত নেতা এবং কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য আবু জাফর মোহাম্মদ কামাল উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বিষয়ে কলেজের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রত্যেকেই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ যাবত এই ঘটনা ওপেন সিক্রেট। সবাই কমবেশি জানে। আমরাও শুনেছি।’
তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘এখানে একজনকে শাস্তি দেওয়াটা চূড়ান্ত অন্যায়। প্রকৃত অপরাধী কাজী শাহরিয়ার বিন শামস। শাস্তি পেলে তিনি পাবেন। অথবা দুজনেই পাবেন। শুধু ওই ম্যাডাম কেন?’
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) শামীমা ইয়াসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ একাডেমিক কাজে প্রয়োজন না থাকায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এরকম কোনো অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। কোনো লিখিতও আসেনি।’
তিনি জানান, কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে, অভিযুক্ত শিক্ষক কাজী শাহরিয়ার বিন শামসের স্ত্রীর সঙ্গে কথা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলেও কোনো অভিযোগ করেননি বলে তিনি জানান।
সূত্র: ফেস দ্যা পিপল



























