শুক্রবার ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২

নাজমুন নাহার

প্রকাশিত: ১৬:৫৬, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্টে ধরা পড়ল দেশে ব্যাপক হারে ক্লোন ফোন ও ভুয়া IMEI এর ব্যবহার

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্টে ধরা পড়ল দেশে ব্যাপক হারে ক্লোন ফোন ও ভুয়া IMEI এর ব্যবহার
ছবি: সংগৃহীত

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) চালুর পর বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে বিপুল সংখ্যক ক্লোন ও নকল মোবাইল ফোন সক্রিয় রয়েছে, যেগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে ভুয়া ও ডুপ্লিকেট IMEI নম্বর।

লাখো ভুয়া ও অবৈধ IMEI সক্রিয়

NEIR–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কে “১১১১১১১১১১১১১”, “০০০০০০০০০০০০০”, “৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯”–এর মতো সম্পূর্ণ অবৈধ IMEI প্যাটার্নও সক্রিয় রয়েছে। আপাতত এসব ডিভাইস বন্ধ না করে “গ্রে” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যাতে হঠাৎ করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত না হয়।

নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন নাগরিকরা

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ অজান্তেই নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ডিভাইস কখনোই রেডিয়েশন টেস্ট, SAR (Specific Absorption Rate) পরীক্ষা বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়নি। তা সত্ত্বেও এসব ফোন চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কেই নির্বিঘ্নে চলমান রয়েছে।

এক IMEI ব্যবহৃত হয়েছে কোটি কোটি বার

গত ১০ বছরের ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু IMEI নম্বর ভয়াবহ মাত্রায় ডুপ্লিকেট হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ নম্বরটি একাই ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪ বার পাওয়া গেছে—যেখানে বিভিন্ন ডকুমেন্ট আইডি, MSISDN ও IMEI–এর সমন্বয় ছিল ভিন্ন ভিন্ন।

IoT ডিভাইসও জড়িত থাকার আশঙ্কা

কর্তৃপক্ষের মতে, এসব IMEI শুধু স্মার্টফোনেই নয়, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ডিভাইসেও ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন—SIM–সংযুক্ত CCTV ক্যামেরা বা অন্যান্য ডিভাইস একই IMEI দিয়ে আমদানি ও ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমানে মোবাইল অপারেটররা IMEI দেখে ফোন, IoT বা অন্য ডিভাইস আলাদা করে শনাক্ত করতে পারছে না। বৈধভাবে আমদানি করা IoT ডিভাইস আলাদা করে ট্যাগ করার কাজ শুরু হয়েছে।

নেটওয়ার্কে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডুপ্লিকেট IMEI নম্বরগুলোর মধ্যে রয়েছে ৪৪০০১৫২০২০০০, যা ব্যবহার হচ্ছে প্রায় উনিশ লাখ ঊনপঞ্চাশ হাজার আটাশি ডিভাইসে। এছাড়া ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ নম্বরটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় সতেরো লাখ আটান্ন হাজার আটশ আটচল্লিশ ডিভাইসে এবং ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নম্বরটি পাওয়া গেছে প্রায় পনেরো লাখ তেইশ হাজার পাঁচশ একাত্তর ডিভাইসে।

এ ছাড়া মাত্র এক অঙ্কের শূন্য (০) IMEI ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ ছিয়াশি হাজার তিনশ একত্রিশ ডিভাইসে। একইভাবে ১৫১৫১৫১৫১৫১৫১৫ নম্বরটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় দুই লাখ দশ হাজার সাঁইত্রিশ ডিভাইসে এবং ৩৫৪৬৪৮০২০০০০০০ নম্বরটি সক্রিয় রয়েছে প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার পাঁচশ ছেচল্লিশ ডিভাইসে।

এমন আরও বহু IMEI রয়েছে, যেগুলো লক্ষাধিক ডিভাইসে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আর্থিক প্রতারণা ও মোবাইল চুরির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক

এই সমস্যা সরাসরি ডিজিটাল অপরাধের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল প্রতারণা হয়েছে অনিবন্ধিত ডিভাইস ব্যবহার করে। এছাড়া BTRC ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রতিষ্ঠানের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৮৫ শতাংশ e-KYC জালিয়াতি হয়েছে অবৈধ বা রি–প্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট দিয়ে।

বছরে লাখো মোবাইল ফোন চুরি

২০২৩ সালে দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও কয়েক লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অধিকাংশ চুরি হওয়া ফোন আর উদ্ধার হয়নি।

৯০ দিন কোনো ফোন বন্ধ করা হবে না

এদিকে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সঙ্গে অস্বাভাবিক সংখ্যক সিম বা ডিভাইস দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, আগামী ৯০ দিন কোনো অবৈধ বা ক্লোন ফোন বন্ধ করা হবে না। তিনি সবাইকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।

তিন বিলিয়নের বেশি ডেটা জমা পড়েছে NEIR–এ

২ জানুয়ারি (শুক্রবার) ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, মোবাইল অপারেটররা ৩ বিলিয়নের বেশি ঐতিহাসিক ডেটা NEIR–এ জমা দিয়েছে। ফলে সাময়িকভাবে অনেকের NID–তে অতিরিক্ত সিম বা ডিভাইস দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে পুরোনো ডেটা আর্কাইভ করা হবে এবং শুধু বর্তমানে সক্রিয় ডিভাইসগুলোই প্রদর্শিত হবে।

কারিগরি সমস্যা ও নিরাপত্তা জোরদার

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, নতুন প্ল্যাটফর্ম চালুর শুরুতে কারিগরি সমস্যা স্বাভাবিক। আগেও VAPT (Vulnerability Assessment and Penetration Testing) করা হয়েছিল, তবে এখন নতুন করে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

NEIR নতুন নয়, উন্নত সংস্করণ

তিনি জানান, NEIR পুরোপুরি নতুন কোনো সিস্টেম নয়। এটি প্রথম চালু করার চেষ্টা হয়েছিল ২০২১ সালে, বর্তমানে অতিরিক্ত ফিচার যুক্ত করে কার্যকর করা হয়েছে।

NID–ভিত্তিক সিম সীমা কমানো হয়েছে

বাংলাদেশে একসময় একটি NID–তে সর্বোচ্চ ২০টি সিম নেওয়ার সুযোগ ছিল, পরে তা ১৫, এখন ১০টিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে। তাই ঐতিহাসিক ডেটায় বেশি সিম বা ডিভাইস দেখা অস্বাভাবিক নয়।

নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে NEIR

কর্তৃপক্ষ বলছে, NEIR নাগরিকদের জানতে সাহায্য করবে—তাদের NID ব্যবহার করে কোনো আর্থিক অপরাধ, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি বা অনলাইন জুয়া পরিচালিত হচ্ছে কি না।

ডেটা সুরক্ষায় বাড়তি ব্যবস্থা

ডেটাবেস সুরক্ষায় JWT টোকেন, রেট লিমিটিং এবং সীমিত API অ্যাক্সেস চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষায় আরও একটি নিরাপত্তা স্তর যোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ মোবাইল ব্যবস্থার দিকে যেতে জনসচেতনতা ও সহযোগিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

আরও পরুন: