রোববার ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫৯, ১০ অক্টোবর ২০২৬

দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা, প্রস্তুত ২০ হাজার পুলিশ

দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা, প্রস্তুত ২০ হাজার পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিক্ষোভের আশঙ্কায় রাজধানী নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। জন্তর মন্তরে সমর্থকদের জড়ো করতে তৎপর ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

শনিবার (১০ অক্টোবর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০ জুলাইয়ের ঘটনার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবারের নিরাপত্তাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। সেদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় বিশৃঙ্খলা ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। ফলে এবারের বিক্ষোভ মোকাবিলায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে প্রশাসন।

পুলিশ বিক্ষোভের অনুমতি না দিলেও আয়োজকেরা কর্মসূচি পালনে অনড়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে গণপরিবহন, সড়ক চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থায় একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব স্টেশনের মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেট। এ ছাড়া শনিবার সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল, এমন অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ২৫০টির বেশি ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেনের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।

যোগাযোগব্যবস্থাতেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে জনপথ- কর্তব্য পথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।

এতসব বিধিনিষেধের মধ্যেও কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা পরিকল্পনা অনুযায়ী জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে এগিয়ে যাবেন।

সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিক্ষোভের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা বলা হলেও মেট্রো ও ট্রেন বন্ধ এবং সড়ক অবরুদ্ধ করে রাখার কারণে মানুষের অসুবিধা হচ্ছে না কি?

দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তাপরিকল্পনায় দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পদক্ষেপ যেন নতুন করে সমালোচনার জন্ম না দেয়, তা নিশ্চিত করা। কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের নয়াদিল্লি জেলায় প্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি নিষিদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে দিতে হবে।

পুলিশ জন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরকে ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেখানে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা। এতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকবে।

নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারির ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে। নয়াদিল্লি জেলার বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে অডিও ধারণের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

জন্তর মন্তরে প্রবেশের সড়কগুলোতে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে। এর শেষ দিকের কয়েকটি স্তর ঝালাই করে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে সেগুলো ভেঙে অতিক্রম করা কঠিন হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে লাউডস্পিকার বসিয়ে রেকর্ড করা ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে, বিক্ষোভের অনুমতি নেই।

ঘোষণায় সাধারণ মানুষকে জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেওয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকেও বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে আসা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন লজ ও হোটেলে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। হোটেল ব্যবস্থাপকদের অতিথিদের বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেওয়া ব্যক্তি ও সম্পত্তির মালিকদেরও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের কাছে সম্পত্তি ভাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এবারের নিরাপত্তাপরিকল্পনায় পুলিশের আচরণ ও অভিযান নথিবদ্ধ করার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বিক্ষোভে পুলিশের অসদাচরণ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠার পর এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মাসের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের কথিত অসদাচরণের দৃশ্য দেখা যায়। এর মধ্যে এক নারী বিক্ষোভকারীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

এ ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবং ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন। পাশাপাশি বিক্ষোভ এবং পুলিশের প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের আশা, এসব ভিডিও ও অন্যান্য দৃশ্যমান প্রমাণের মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর দাবি মোকাবিলা এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তদন্তেও এসব ফুটেজ সহায়ক হবে।

এদিকে দিল্লি পুলিশ একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে সব পক্ষকে মানবিকতা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যরাও মানুষ; বাড়িতে তাঁদের জন্য পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করেন। ইউনিফর্ম পরার কারণে একজন মানুষের মানবিকতা হারিয়ে যায় না—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ।

জনপ্রিয়