বিমানবন্দর এলাকায় অপরাধ রুখতে বসছে শতাধিক ক্যামেরা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের টার্গেট করে গড়ে উঠেছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। সুযোগ বুঝে এসব চক্র প্রবাসীদের সর্বস্ব লুটে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বোনের বিয়েতে পাঠানো স্বর্ণ লুটের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাওলায় সংঘটিত ওই ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এ ঘটনার পর বিমানবন্দর এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। কাওলা থেকে উত্তরার জসিম উদ্দিন মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকাকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গন এলাকায় পোশাকে ও সাদাপোশাকে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আমরা পুরো এলাকাকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছি। প্রায় ১০০টির মতো সিসি ক্যামেরা স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের ২৫টি সিসি ক্যামেরা চালু রয়েছে। থার্ড টার্মিনালের সামনে থেকে গোলচত্বর মোড় পর্যন্ত ওই এলাকায় এগুলো কাজ করছে। বর্তমানে ক্রাউন প্লাজা থেকে শুরু করে জসিম উদ্দিন পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে, অর্থাৎ বিমানবন্দরের স্টেশনের সামনে থেকে রেললাইন পার হয়ে হজ ক্যাম্প পর্যন্ত পুরো এলাকাকে আমরা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনছি। দ্রুত এসব সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ সম্পন্ন হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আমাদের প্রবাসী ভাইদের টার্গেট করে কিছু দুর্বৃত্ত নানা অঘটন ঘটানোর চেষ্টা করছে। এগুলো প্রতিরোধে এসব সিসি ক্যামেরা ব্যাপক সহায়ক হবে। কেউ অপরাধ করলে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবাসীদের টার্গেট করে এ এলাকায় ছিনতাই চক্রের পাশাপাশি আরও দুটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি চালকবেশী ডাকাত চক্র এবং অন্যটি অজ্ঞান পার্টির চক্র।
জানা যায়, বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সামনের মোড়, হাতের বাঁদিকে কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবের বাস কাউন্টারের সামনে এবং পুলিশ বক্স থেকে কিছুটা দক্ষিণে কাওলার মোড় এলাকায় ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে।
বিমানবন্দরের সামনে ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘দিন-রাত এই এলাকায় ছিনতাইকারীরা এক প্রকারের অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। প্রবাসী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অনেকেই প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘দিনে ভবঘুরে টোকাই ছিনতাইকারী থাকলেও রাতে সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্র এলাকায় ঘোরাফেরা করে। এরাই প্রবাসীদের টার্গেট করে সর্বস্ব লুটে নেয়।’
আব্দুল হালিম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিমানবন্দরের এই স্থানে দিন-রাত সবসময় লোকজনের সমাগম থাকে। প্রবাসীরা আসে-যায়, এ কারণে অনেক লোকের জমায়েত থাকে। কিন্তু কিছু লোকজন আছে, যারা এসব প্রবাসী ভাইকে টার্গেট করে সর্বস্ব নিয়ে নেয়। এদের কাছে অস্ত্রও থাকে। এদের চিনলেও কেউ কিছু বলে না।’
বিশেষ করে রাতের বেলায় দুই-তিনটি স্থান খুবই ভয়ংকর বলে জানান তিনি।
জানা যায়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এক ধরনের চালক রয়েছে, যারা এমন প্রবাসীদের টার্গেট করে যাদের জন্য কোনো গাড়ি কিংবা আত্মীয় বিমানবন্দরে আসেননি। তারা নানা কৌশলে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর পথে তাদেরই চক্রের সদস্যদের গাড়িতে তোলা হয়।
এ সময় প্রবাসীরা আপত্তি করলেও অল্প ভাড়ার কথা বলে তাদের রাজি করানো হয়। এরপর রাস্তার মাঝে ফাঁকা স্থান পেলেই শুরু হয় নির্যাতন। প্রবাসীকে মারধর করে তাদের কাছ থেকে সর্বস্ব নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রবাসী কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনরা এ ধরনের ঘটনার শিকার হন। অনেকে দেশের বাইরে যেতে দুই-তিন দিন আগেই বিমানবন্দরে চলে আসেন। তারা আশপাশের হোটেলে থাকেন। এরপর ফ্লাইট হলে চলে যান। পরে তাঁদের স্বজনরা রাতে অল্প ভাড়ার গাড়িতে উঠতে গিয়ে এ ধরনের ঘটনার শিকার হন।
আবার অনেকে সরাসরি বিমানবন্দরে চলে আসেন এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজন বিমানবন্দরে আসেন না। তারাও অল্প ভাড়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান।
এদিকে অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের বেশভূষাও আলাদা বলে জানা গেছে। এমন পোশাক পরে তারা আসে, যাতে মনে হয় তারাও বিদেশ থেকে এসেছে। বিমানবন্দরের বাইরে আসা-যাওয়া করা প্রবাসীদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে, যাতে মনে হয় তারা পূর্বপরিচিত। এরপর নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে সর্বস্ব লুট করে নেয়।
স্থানীয়রা বলেন, মাঝে মাঝে এমন সংবাদ পাওয়া যায়। অজ্ঞান পার্টির চক্রের সদস্যরা এমন বেশভূষায় থাকে যে তাদের সহজে বোঝার উপায় থাকে না।
এসব অপরাধের বিষয়ে বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘এ এলাকায় প্রবাসীদের টার্গেট করে যেন কোনো অপরাধ না হয়, তার জন্যই মূলত আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নজরদারি বাড়িয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘অতি সম্প্রতি ভিক্ষুকসহ টোকাই, যারা সবসময় প্রবাসীদের আসা-যাওয়ার সময় বিরক্ত করে, তাদের আমরা আটক করেছি। প্রতিনিয়ত তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।’
এদিকে এপিবিএনের একটি সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পোশাকে ও গোয়েন্দা ইউনিটকে এ ধরনের অপরাধ যেন না হয়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।



























