বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৫২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অসহায়ের পাশে ‘গরিবের বন্ধু’ গাজীপুরের ডিসি

অসহায়ের পাশে ‘গরিবের বন্ধু’ গাজীপুরের ডিসি
ছবি: সংগৃহীত

চোখে আলো নেই, তবু জীবনের অন্ধকার কাটিয়ে একটি স্থায়ী চাকরির স্বপ্ন দেখেন মিজানুর রহমান। দুর্ঘটনায় এক পা ও এক হাতের আঙুল হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন রোকসানা। আর স্ট্রোকের পর কর্মক্ষমতা হারিয়ে অন্যের দেওয়া জমিতে একটি ঘর তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন শুক্কুর আলী।

জীবনের নানা প্রতিকূলতায় আটকে পড়া এই তিন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক গণশুনানিতে নিজেদের কষ্ট ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন তারা। তাদের কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক।

শ্রীপুর উপজেলার বনখরিয়া এলাকার ৩৯ বছর বয়সী মিজানুর রহমান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ঢাকার জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে মাদরাসার হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করছে।

অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্বও মিজানুরের ওপর। কিন্তু কোনো জমিজমা না থাকায় সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

গণশুনানিতে জেলা প্রশাসকের কাছে মিজানুর জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তিনি একটি সরকারি চাকরি চান। একই সঙ্গে নিজের পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছার কথাও জানান।

মিজানুরের কথা শুনে তার পাশে থাকার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। তার মেয়েও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি মিজানুর চাইলে নিজ উদ্যোগেও তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলেন জেলা প্রশাসক।

গাজীপুর মহানগরের মাষ্টারবাড়ি এলাকায় থাকেন রোকসানা। তার বাড়ি বগুড়ায়। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি।

ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় ডান পা ও বাঁ হাতের তিনটি আঙুল হারান রোকসানা। এরপর থেকেই জীবন চালাতে তাকে ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।

একপর্যায়ে সুখের আশায় রাজমিস্ত্রির সহকারীকে বিয়ে করেন তিনি। তবে স্বামীর আয় ছিল অনিয়মিত। এরই মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হন রোকসানা। সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই প্রতিপক্ষের হামলায় তার স্বামী নিহত হন।

এরপর সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে চলে আসেন রোকসানা। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও অসহায়ত্বের কারণে তাকে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরতে হয়।

জেলা প্রশাসককে ‘গরিবের বন্ধু’ মনে করে তার কাছে নিজের কষ্টের কথা জানান রোকসানা। তার পরিস্থিতি শুনে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেন মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। পরে গাজীপুরের কাশিমপুরের একটি সুনামধন্য পোশাক কারখানায় তার চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তিনি।

পূবাইলের হারবাইদ এলাকার শুক্কুর আলী একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। নিজের কোনো ঘরবাড়ি না থাকায় অন্যের করুণাই ছিল তার ভরসা। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করে কর্মক্ষমতা হারানোর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

নিজে কাজ করতে না পারায় পরিবারের দায়িত্ব পালন করা তো দূরের কথা, নিরাপদে থাকার জায়গাটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তার।

শুক্কুরের দুর্দশা দেখে এক ব্যক্তি তাকে ঘর নির্মাণের জন্য কিছু জমি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ঘর তৈরির সামর্থ্য নেই তার। তাই সহযোগিতার আশায় জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন তিনি।

শুক্কুরের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক। তাকে আশ্বস্ত করে ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করার কথা জানান মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রতি বুধবার সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা শুনি। তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা, যা কাউকে বলতে পারেন না, সেগুলো শুনে ব্যবস্থা নিই।’

জেলা প্রশাসককে জনগণের কাছে ‘গরিবের বন্ধু’ হিসেবে দেখা হয়—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। মানুষ আমাকে কীভাবে দেখবে, সেটা মানুষের বিষয়। কোনো কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে আমি কাজ করি না। নিজের সন্তুষ্টির জন্য অসহায় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। তাদের যদি উপকার হয়, তাতেই আমি খুশি। মানুষের কল্যাণ হলে আমার সময়টা কাজে লাগল। আমি সন্তুষ্ট।’

সর্বশেষ

জনপ্রিয়