কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ জারি
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নতুন আইনগত কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অধ্যাদেশটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি।
তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, লিঙ্গ, জেন্ডার পরিচয় কিংবা জন্মস্থান নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করাই এ অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য।
সুচিস্মিতা তিথি জানান, অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডে প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থিত সরকারি অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর থাকবে।
অধ্যাদেশে যৌন হয়রানির একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এতে শারীরিক, মৌখিক, অ-মৌখিক, ডিজিটাল ও অনলাইন আচরণসহ জেন্ডারভিত্তিক সব ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মেসেজিং প্ল্যাটফর্মসহ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়রানিও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অধ্যাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (আইসিসি) গঠন বাধ্যতামূলক করা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত পরিচালনা, তদন্তকালীন সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং উপযুক্ত শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।
শাস্তির পরিধির মধ্যে তিরস্কার থেকে শুরু করে পদাবনতি, চাকরিচ্যুতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় অধ্যাদেশটি সারভাইভার-কেন্দ্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। অভিযোগের কারণে কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা নিরুৎসাহিত না হন।
অসংগঠিত খাতে, যেখানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন সম্ভব নয়, সেখানে স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এসব কমিটি গঠিত হবে, যাতে সব নাগরিক কার্যকরভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন।
অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সুচিস্মিতা তিথি বলেন, সরকার বিশ্বাস করে এ অধ্যাদেশ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি দেবে এবং একটি সম্মানজনক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



























