বুধবার ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৫৩, ৪ মার্চ ২০২৬

৮ মাসে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ঘুষ লেনদেন শতকোটি

৮ মাসে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ঘুষ লেনদেন শতকোটি
ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে। 

খবরের কাগজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।

আট মাসে (অক্টোবর-২৪ থেকে এপ্রিল-২৫ পর্যন্ত) নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের অফিসে বদলির আদেশ পেয়েছেন তারা। অতীতে কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।

বদলির নীতিমালা অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের অফিসে অনুরূপভাবে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আট মাসে এই নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি। 

বদলির বিধান অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে এবং ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করতে হয়। তবে আট মাসের ওই সময়কালে ঘুষের বিনিময়ে ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের অনেককেই পোস্টিং দেওয়া হয়েছে উচ্চতর গ্রেডের কার্যালয়ে। এ ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের ‘শাস্তিমূলকভাবে’ ‘বি’ বা ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেককেই বারবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে। কাউকে কাউকে যোগদানের আগের দিন পুনরায় অন্য অফিসে বদলির নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বদলি-বাণিজ্যের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, গত বছরের ১ জুন খোদ আইন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে সতর্কতা জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলার রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নে কোনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক কোনো ধরনের প্রলোভন, প্রস্তাব বা প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হলো। কিন্তু এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই শত শত সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে বিপুল অঙ্কের ঘুষের লেনদেন হয়েছে। এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আর কোনো বদলির আদেশ হয়নি।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে যুগ যুগ ধরে ‘ঘুষ-বাণিজ্য’ হয়ে আসছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে অন্তত সরকারি ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ওই আট মাসে ‘ঘুষ-বাণিজ্যে’ কোনো ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। দুদক বা আইন প্রয়োগকারী যেকোনো কর্তৃপক্ষ শুধু নীতিমালা ভঙ্গের বিষয়টি অনুসন্ধান করলেই ‘ঘুষ-বাণিজ্যের’ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাবে।” 

এ ব্যাপারে দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, ‘পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বা অন্য যেকোনোভাবে অভিযোগ দুদকের নজরে এলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা বা অন্য যেই হোক না কেন, কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

এদিকে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। 

আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক জেলা রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি ও বদলির আদেশ দেন। তবে সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রথম বদলির আদেশ দেন সে বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। আদেশে মোট ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ‘সি’ গ্রেডের কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে বদলি করে অধিদপ্তরের নীতিমালা ভঙ্গ করা হয়। এ আদেশে (২৯ সেপ্টেম্বর) সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। এর চার মাস পর ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মনীষাকে হরিপুর থেকে বদলি করা হয় দিনাজপুরের হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে হাকিমপুরে যোগদানের আগের দিন মনীষাকে আবার বদলি করা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। একইভাবে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হয়। তবে ‘তদবিরের মাধ্যমে’ মাত্র দুদিনের মধ্যে রেহানা ১১ এপ্রিল বদলি নিয়ে বরিশালের মুলাদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সাব-রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য্যকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বদলি করা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তিনিও দুদিন পরই বদলি নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চলে আসেন। ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আব্দুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলি করা হয়। যোগদানের আগের দিন ৬ অক্টোবর এই বদলি স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। 

আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের আগস্টে আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিসংক্রান্ত অন্তত ১৬টি আদেশ জারি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে ৮৭ জনকে বদলি করা হয়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আদেশে ১৯৫ জনকে বদলি করা হয়। আদেশগুলো হলো–২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ১০ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭ জন, একই বছরের ৭ অক্টোবর ৫ জন, ১ ডিসেম্বর ৩৮ জন, ১৯ ডিসেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জানুয়ারি ৫ জন, ১৫ জানুয়ারি ১২, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৭, ৫ ফেব্রুয়ারি ১০, ৯ ফেব্রুয়ারি ২, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৬, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২, ১৭ মার্চ ২৬, ৯ এপ্রিল ৩৬, ১০ এপ্রিল ৪ এবং ২৭ এপ্রিলে ৪৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে তৎকালীন আইন সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের আলোকে নিবন্ধন বিভাগের সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিসংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রারগণের বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সাব-রেজিস্ট্রার অফিসসমূহের বিন্যাসকৃত শ্রেণি (এ.বি.সি) প্রযোজ্য হবে। নবনিযুক্ত বা সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারদেরকে ‘সি’ শ্রেণির অফিসে পদায়ন করা হবে। বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াসহ চাকরি স্থায়ী করা হলে ‘সি’ শ্রেণির অফিসে ৫ বছর সন্তোষজনক চাকরি, জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সুযোগ থাকা সাপেক্ষে তাদেরকে ‘বি’ শ্রেণির অফিসে পদায়ন করা যাবে। অনুরূপভাবে ‘বি’ শ্রেণির অফিসে ৫ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর সুযোগ থাকা সাপেক্ষে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ‘এ’ শ্রেণির অফিসে পদায়ন করা যাবে। কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যক্রম অসন্তোষজনক হলে কর্তৃপক্ষ তাকে গুরুত্বপূর্ণ অফিসে অযোগ্য বিবেচনায় জনস্বার্থে নিম্নশ্রেণিভুক্ত অফিসে বদলি করতে পারবে। তবে অনুরূপ ক্ষেত্রে তার অসন্তোষজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রাররা সাধারণত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির অফিসে ৩ বছরের জন্য কর্মরত থাকবেন। তবে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে এই মেয়াদের আগেও তাদেরকে বদলি করতে পারবে। কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার ঢাকা/চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদকাল কাজ করলে পরে ৬ বছরের মধ্যে তাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার কোনো অফিসে পদায়ন করা যাবে না। কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার রাজশাহী/খুলনা/বরিশাল/সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদকাল কাজ করলে পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে তাকে রাজশাহী/খুলনা/বরিশাল/সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকার কোনো অফিসে পদায়ন করা যাবে না। কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার ঢাকা/চট্টগ্রাম জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদকাল কাজ করলে পরবর্তী ৬ বছরের মধ্যে তাকে ঢাকা/চট্টগ্রাম জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন করা যাবে না। কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার গাজীপুর/নারায়ণগঞ্জ জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদকাল কাজ করলে পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে তাকে গাজীপুর/নারায়ণগঞ্জ জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন করা যাবে ন। কোনো সাব-রেজিস্ট্রার কোনো অফিসে একবার পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদকাল কাজ করলে দ্বিতীয়বার তাকে ওই অফিসে পদায়ন করা যাবে না। পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার কারণে অবসর আসন্ন প্রায় (৬ মাসের আগে নয়) এমন সাব-রেজিস্ট্রারকে তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ জেলায় বা পাশের জেলার কোনো অফিসে পদায়ন করা যাবে। কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের স্বামী/স্ত্রীর কর্মস্থল বা এর নিকটবর্তী স্থানে নিয়োগ বদলির বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ উপরোল্লিখিত বিধানাবলি শিথিল করতে পারবে।’ 

কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার গণমাধ্যমকে জানান, বিদ্যমান এই নীতিমালা অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে উপেক্ষা করা হয়েছে।

সূত্র: খবরের কাগজ