বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১৭, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজ আসবে ২০৩১ সালে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজ আসবে ২০৩১ সালে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত
ছবিঃ সংগৃহীত

বোয়িং ও এয়ারবাসের কাছ থেকে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, উড়োজাহাজ কেনা শোরুম থেকে গাড়ি কেনার মতো নয়। অর্ডার দেওয়ার পর উড়োজাহাজ তৈরি হতে এবং ডেলিভারি পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। বোয়িংয়ের সঙ্গে যে ২৫টি উড়োজাহাজের চুক্তি হয়েছে, তার প্রথমটি আসবে ২০৩১ সালে। এরপর ২০৩২, ২০৩৩, ২০৩৪ ও ২০৩৫ সালে পর্যায়ক্রমে সেগুলো আসবে। অন্যদিকে এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলো ২০৩৩ সাল থেকে আসা শুরু হবে।

তিনি বলেন, “আমরা যে আর্থিক গ্যারান্টি দিয়েছি, তার ভিত্তিতে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উড়োজাহাজ তৈরির যন্ত্রাংশের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে আদেশ দেবে। এরপর মূল কোম্পানিতে যন্ত্রাংশগুলো অ্যাসেম্বল করে পূর্ণাঙ্গ উড়োজাহাজ তৈরি হবে। প্রতিটি উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার পর সেটি দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে যে আয় হবে, সেই অর্থ থেকেই মূল্য পরিশোধ করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন অর্ডার না দিলে ১০-১২ বছর পর আবারও বিমানের বহরে উড়োজাহাজস্বল্পতা দেখা দেবে। নিজেদের পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকলে দেশের যাত্রীদের বিদেশি এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করতে হয়। এতে দেশের অর্থ বাইরে চলে যায়। আর ১০ বছর পর একই উড়োজাহাজ কিনতে গেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে আরও বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তাই এখন অর্ডার দেওয়াটা সাশ্রয়ী এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত।”

অতীতে দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব ছিল বলেই আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গ্যাসের কথাই ধরুন। সময়মতো রিগ বসিয়ে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। কূপ খনন করতে গেলেও এখন তিন-চার বছর সময় লাগবে। এভিয়েশন খাতেও আমরা যদি আজ ১০-১২ বছর পরের কথা না ভাবি, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকটে পড়তে হবে।”

নতুন উড়োজাহাজ আসতে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগবে জানিয়ে এই সময়ে বহরের চাহিদা মেটাতে ড্রাইলিজের মাধ্যমে উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, “লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অর্থসচিবকে সভাপতি করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব ও প্রতিনিধি এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সদস্যরা রয়েছেন। প্রতিটি চুক্তি যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। লিজে নেওয়া উড়োজাহাজ বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে আয় করা হবে। সেই আয় থেকেই লিজের কিস্তি পরিশোধ করা হবে। এতে সরকারের ওপর আলাদা করে বড় আর্থিক চাপ পড়বে না।”

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তৃতীয় টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু করা হবে। সব প্রস্তুতি ঠিক থাকলে আগামী বছরের মে মাসের মধ্যে এটি পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে। শুরুতে স্বল্পসংখ্যক ফ্লাইট দিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে। বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৩০ মাস এই বিশাল অবকাঠামোটি পড়ে ছিল। কার্যত কোনো কাজ হয়নি। ওই সময় যন্ত্রপাতি সচল রাখা এবং কর্মীদের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেটিও এখন বাড়তি খরচ হিসেবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য নিতে হচ্ছে। আমরা পড়ে থাকা এই সম্পদ দ্রুত কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি।”

ট্রলিসংকট ও লাগেজ পেতে দেরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চার হাজার ১৯০টি ফ্রি ট্রলি রয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে ২০০ ট্রলি যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আরও ১৫০টি ট্রলি। নতুন এই ট্রলি সংযোজনের ফলে ট্রলিসংখ্যা এখন চার হাজার ৩৯০টিতে উন্নীত হওয়ায় সংকটের অনেকাংশ সমাধান হবে। সাধারণত লাগেজ পেতে ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। তবে উড়োজাহাজ আউটার বে-তে পার্ক করা থাকলে সেখান থেকে ট্রাকে করে লাগেজ আনতে হয়। আবার একসঙ্গে অনেকগুলো ফ্লাইট অবতরণ করলেও সময় বেড়ে যেতে পারে। বর্তমান টার্মিনাল ১ ও ২ ধারণক্ষমতার দেড় গুণ যাত্রী হ্যান্ডল করছে।”

তিনি আরও বলেন, “লন্ডনসহ বিশ্বের বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতেও নেমে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। ইমিগ্রেশন পার হতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। তা ছাড়া সব বিমানবন্দরে ফ্রি ট্রলি দেওয়া হয় না। কোথাও কোথাও চার্জ পরিশোধ করতে হয়। তার পরও আমরা আমাদের লাগেজ ডেলিভারি সময় আরও কমাতে চাই। এ জন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগে আমরা কেপিআই ঠিক করেছি। সেখানে প্রথম লাগেজ ও শেষ লাগেজ ডেলিভারির সময়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।”

দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তি এবং এভিয়েশন খাতের ঋণ পরিশোধের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তৃতীয় টার্মিনালের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ জাপানি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়া হলেও যৌথ চুক্তির অধীনে ৫০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বাংলাদেশ বিমান নিজেই করবে। এতে বিমানের রাজস্ব আয় থাকবে এবং সেই আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। আমরা এরই মধ্যে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও বিমানের এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করেছি। আগামী ডিসেম্বরে আরও ৯০০ কোটি টাকা পরিশোধের সময়সূচি রয়েছে।”

আইকাওয়ের সিকিউরিটি ও সেফটি অডিট এবং ক্যাটাগরি-১ রেটিং পাওয়ার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইকাও নির্ধারিত নিয়ম মানার কোনো বিকল্প নেই। উড়োজাহাজ বিক্রির সময় বোয়িং ক্যাটাগরি-১ রেটিং পাওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিলেও আমাদের নিজেদের সব শর্ত ও প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে। অডিটের প্রয়োজনীয়তা পূরণ না করলে শুধু কারো আশ্বাসে ক্যাটাগরি-১ পাওয়া সম্ভব নয়। অডিটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিমান, পুলিশ, এনএসআই, এনবিআর, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সব নিরাপত্তা সংস্থাকে নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করা হচ্ছে। অডিটে সফল হলে ক্যাটাগরি-১ রেটিং এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট পাওয়ার ক্ষেত্রে আর বড় কোনো বাধা থাকবে না।”

জাতীয় পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পাঁচ-ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানটি ঝুলে ছিল। আমরা সম্প্রতি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ট্যুরিজম কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে থিমভিত্তিক পর্যটন স্পট শনাক্ত করে উন্নয়ন করব। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এভিয়েশন ও পর্যটন খাত এগিয়ে নিতে আমরা কাজ করছি। আমাদের চেষ্টা থাকবে এ দুই খাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের মানুষের জন্য এর সুফল নিশ্চিত করা।”

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

জনপ্রিয়