ভবঘুরের ছদ্মবেশে একে একে ৬ জনকে হত্যা করেন সম্রাট: পুলিশ
সাভার মডেল থানার ঢিলছোড়া দূরত্বে, সাভার প্রেসক্লাবের পাশেই অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার। এই ভবনটিতেই গত সাত মাসে একের পর এক সংঘটিত হয়েছে ছয়টি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) জোড়া লাশ উদ্ধারের পর সামনে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তদন্তে জানা যায়, এসব হত্যাকাণ্ড কোনো পেশাদার অপরাধীর কাজ নয়; বরং থানার সামনেই ঘোরাঘুরি করা এক পরিচিত ভবঘুরেই এই নৃশংস সিরিয়াল কিলিংয়ের সঙ্গে জড়িত।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত মাস আগে সাভার মডেল মসজিদের সামনে প্রথম এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর গত বছরের ২৯ আগস্ট সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থান থেকে গত ১৯ ডিসেম্বর আরও একটি মরদেহ পাওয়া যায়। সর্বশেষ রোববার (১৮ জানুয়ারি) ওই পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের ভবন থেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয় দুটি মরদেহ।
রোববার দুপুরে কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে আগুনে পোড়া জোড়া লাশ উদ্ধারের পর তদন্তে গতি আসে। তদন্তকারীরা আগের হত্যাকাণ্ডের সময় স্থাপিত সিসিটিভি ফুটেজ এবং এক সাংবাদিকের ধারণ করা একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেন। ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি কাঁধে করে মরদেহ বহন করছে—যাকে এলাকাবাসী এতদিন ছদ্মবেশী ভবঘুরে হিসেবেই চিনত।
এই সূত্র ধরেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মশিউর রহমান খান সম্রাটকে আটক করে। জানা যায়, গত শুক্রবার ওই পরিত্যক্ত ভবনে সম্রাট ও এক নারীর ভিডিও ধারণ করেছিলেন সাংবাদিক সোহেল রানা। ভিডিওতে ওই নারী নিজেকে ‘সোনিয়া’ বলে পরিচয় দেন। এর মাত্র দুদিন পরেই সেই নারীর আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার হয়। সিসিটিভি ফুটেজে সম্রাটের চলাফেরা এবং ভিডিওর কথোপকথন পর্যালোচনা করে পুলিশ নিশ্চিত হয়—সম্রাটই এই সিরিয়াল কিলিংয়ের মূল হোতা।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী জানান, সম্রাট একজন মানসিক বিকৃত বা ‘সাইকোপ্যাথিক’ কিলার। তার টার্গেট ছিল শুধুই ভবঘুরে মানুষ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে—গত সাত মাসে একই স্থানে ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। প্রতিটি হত্যার ধরন ছিল একই রকম এবং অত্যন্ত নৃশংস। দীর্ঘদিন ধরে সে পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার ক্রাইমসিন ইউনিটের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাভার ব্যাংক কলোনি ও লালটেক এলাকায় ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়েছে।
থানা থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে, সেনাক্যাম্প ও একটি সরকারি কলেজের পাশেই এমন ভয়াবহ সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ময় ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন,
“যাকে প্রতিদিন চুপচাপ বসে থাকতে বা বিড়বিড় করতে দেখতাম, সেই মানুষটাই যে ঠাণ্ডা মাথার খুনি—ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।”
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “নিহতদের সবাই ভবঘুরে শ্রেণির মানুষ। কেন সে এ ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে, তার মোটিভ উদ্ঘাটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার তাকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে।”



























