বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৪২, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চাঁদা না দেওয়ায় রপ্তানিমুখী কারখানা লুট, আসামিকে ধরেও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ

চাঁদা না দেওয়ায় রপ্তানিমুখী কারখানা লুট, আসামিকে ধরেও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, সন্ত্রাসীরা নগদ অর্থসহ প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। সম্প্রতি উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

কারখানার নাম বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। জিআই তার উৎপাদন হয় কারখানায়। এর মালিক শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপু (৪৩)। সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ ১২টি দেশে রপ্তানি হয় এ জিআই তার।

কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটিতে কর্মীদের মারধর, ভাঙচুর এবং ট্রাক এনে মালামাল লুট করা হয়েছে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়।

ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বিএনপির রূপগঞ্জ উপজেলার সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনের পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপির একদল লোক বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মনোয়ার হোসেনের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পাশাপাশি মাসে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ার দাবিও আছে তাদের। চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়।
কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেন গত শুক্রবার বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে লুটপাট শুরু হয় কারখানাটিতে, যা চলে দেড় ঘণ্টা ধরে। রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানাটিতে যেতে ১৫-২০ মিনিট লাগে।

কিন্তু তিনি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।

কারখানার তিনজন শ্রমিক ও স্থানীয় একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলাকারীরা কারখানার প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর শাবল দিয়ে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খান বাধা দিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে মারধর করা হয়। ব্যবস্থাপককে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে তাঁদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

হামলাকারীরা কারখানার সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরাও ভেঙে ফেলে, আসবাব ভাঙচুর করে এবং ট্রাক এনে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় কারখানার মালিক মোনোয়ার অপু বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এজাহার সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় বেলায়েত আকন্দ, সজল হোসেন ও কাজল মিয়ার নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল কারখানায় হামলা চালায়। এর আগে তারা মালিকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন, ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন, মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপির কর্মী মো. সজল হোসেন, সাদিকুল, মো. ফাহিম, আজিজ মৌলভি ও বোরহানউদ্দিনের নাম রয়েছে। আসামিদের বেশির ভাগই জিন্দা গ্রামের বাসিন্দা।

এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা নগদ অর্থসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে গেছে। বাদী মনোয়ার হোসেন বলেন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকন ও নিশাত আকন সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম ব্যবহার করে দফায় দফায় চাঁদা দাবি করেছেন। অন্তত চার দফায় বিষয়টি মাহফুজুর রহমানকে জানিয়েছেন তিনি। কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো চাঁদা দাবি করা লোকদের সঙ্গে মীমাংসার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।

মনোয়ার হোসেনের দাবি, মঙ্গলবার মাহফুজুর রহমান ঘটনার সময় হাজির না হলেও তাঁর নির্দেশেই কারখানায় হামলা ও লুটপাট হয়েছে। মামলা করার সময় হুকুমের আসামি হিসেবে এজাহারে তিনি মাহফুজুর রহমানের নাম উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু থানার ওসি মাহফুজুরের নাম বাদ না দিলে মামলা নেবেন না বলে জানান। তিনি বাধ্য হয়ে মাহফুজুরের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেছেন।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন বলেন, তিনি কারও নাম বাদ দিতে বলেননি। তিনি বলেছেন মামলায় সত্য ঘটনা দিতে।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘কারখানা মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে কোনো দিন দেখিনি। ফলে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে চার দফায় জানানোর দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। জানালে আমি ব্যবস্থা নিতাম। ঘটনার দিন থানা থেকে ফোন পেয়ে আমি বরং খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনজনকে পাঠাই। পরে শুনি এ তিনজনের নামে মামলা হয়েছে।’

মাহফুজুর রহমান বলেন, কারখানাটিতে পরিবেশ দূষণকারী ব্যাটারি উৎপাদন করা হয়—এ কথা তিনি শুনেছেন এবং এ জন্য এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ।

এ বক্তব্যের বিষয়ে কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেন বলেন, মাহফুজুর রহমানকে তিনি সরাসরি জানাননি, জানিয়েছেন লোক মারফত। আর রপ্তানিমুখী জিআই তার ছাড়া তিনি কিছুই উৎপাদন করেন না। ব্যাটারি উৎপাদনের কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা।

মামলা তুলে নেওয়ার জন্য গতকাল বিকেলে মাহফুজুর রহমানের পরিচয় দিয়ে দুই দফা হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন মনোয়ার হোসেন।

জানা গেছে, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেনকে নির্দেশ দেন নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। পরে স্থানীয় জিন্দাপার্কের ভেতর থেকে প্রধান আসামি বেলায়েত আকনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও বেলায়েত আকনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি খোঁজ রাখছেন। এ মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, তা জানতে তিনি রূপগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি। তারা চেষ্টা করছেন এবং অন্য সংস্থায় মামলাটি দেওয়ার কথা চিন্তা করছেন। 

আসামি ধরেও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে আসলে অনেক লোক ছিল। প্রধান আসামিকে ধরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়। আসামির কৌশলে চলে যাওয়ার ঘটনা থাকতে পারে।’

কারখানা লুটের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, সব সময় তাদের কম-বেশি চাঁদা দিতে হয়; কিন্তু এভাবে হামলা ও মালামাল লুট তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মামুন মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যে ধরনের ঘটনার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে, তা যদি সত্য হয়, তবে সেটা ফৌজদারি অপরাধ। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তারা যত বড় নেতাই হোক, দল তখন তাদের অপরাধী হিসেবেই দেখবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ কোনো প্রকার ছাড় পাবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘যেহেতু এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আমরা চাইব বিষয়টি আইনগতভাবে দেখা হোক। দল থেকেও আমরা এ ঘটনার তদন্ত করব এবং তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’