মঙ্গলবার ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:২২, ৩ মার্চ ২০২৬

নোমান গ্রুপের কাপড়ে মানের ঘাটতি পেয়েছে পুলিশ

নোমান গ্রুপের কাপড়ে মানের ঘাটতি পেয়েছে পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের নতুন ইউনিফর্মের জন্য নোমান গ্রুপের সরবরাহ করা কাপড়ের মান নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ল্যাব পরীক্ষায় চুক্তিতে উল্লেখিত মানের ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, যথাযথ মান যাচাইয়ের পরেই কাপড় সরবরাহ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউনিফর্মের কাপড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ময়েশ্চার ম্যানেজমেন্ট বা আর্দ্রতা শোষণক্ষমতা। শরীর থেকে নির্গত ঘাম দ্রুত শোষণ ও উপরে ওঠানোর ক্ষমতার ওপরই কাপড়ের কার্যকারিতা নির্ভর করে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কাপড়ের দামও সাধারণ কাপড়ের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন ইউনিফর্ম নির্ধারণের পর কাপড় সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয় নোমান গ্রুপকে। কিন্তু বিভিন্ন ইউনিট থেকে কাপড়ের মান নিয়ে অভিযোগ আসতে শুরু করলে তা পুনরায় পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী শার্টের কাপড়ে সুতার ঘনত্ব থাকার কথা ছিল ২০৫ জিএসএম (±৫)। কিন্তু পরীক্ষায় তা পাওয়া গেছে ১৯৩ জিএসএম। অর্থাৎ প্রতি পোশাকে ৭ জিএসএম কম রয়েছে।

এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী আর্দ্রতা শোষণক্ষমতা থাকার কথা ছিল ৬ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। নির্ধারিত পরীক্ষাপদ্ধতিতে কাপড়ের এক অংশ ১ সেন্টিমিটার পানিতে ভিজিয়ে ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখলে তা ৫-১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত আর্দ্রতা শোষণ করার কথা। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, সরবরাহ করা কাপড়ে শোষণক্ষমতা রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। ফলে দীর্ঘ সময় ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সদস্যরা অস্বস্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, কাপড়ে ৭ জিএসএম ঘাটতি মানে একই পরিমাণ সুতা দিয়ে বেশি সংখ্যক পোশাক তৈরি সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আগে যেখানে এক কেজি কাপড়ে ১০টি শার্ট তৈরি হতো, জিএসএম কম হলে সেখানে ১৩টি পর্যন্ত তৈরি করা যেতে পারে। এতে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন,  ‘পুলিশের কাপড় সরবরাহের আগে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ল্যাবে মান যাচাই করে নেয়া হয়েছে। যাচাই করা মান দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী হওয়ার পরেই পুলিশ কাপড় বুঝে নিয়েছে। এখানে বেশকিছু ঠিকাদার রয়েছেন, যারা কাজ পাননি। তারাই এখন নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।’

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, নোমান গ্রুপ থেকে মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য সাত লাখ মিটার আয়রন টিসি প্লেইন ফ্যাব্রিক কিনতে খরচ হয়েছে ৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা। ১ লাখ ৭৫ হাজার মিটার টিসি টুইল কমব্যাট ফ্যাব্রিক কিনতে পুলিশের খরচ হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা। জেলা পুলিশের জন্য ১০ লাখ ২০ হাজার মিটার কফি টিসি টুইল কাপড়ের দাম পড়েছে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা। পাশাপাশি মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য পাঁচ লাখ মিটার কফি টিসি টুইল ফ্যাব্রিক কেনা হয়েছে ১৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক বেশি দামে কেনা এবং অস্বস্তিকর হওয়ায় এ পোশাক নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে অনেক পুলিশ সদস্যের মধ্যে। এরই মধ্যে পুলিশ সদস্যরা এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে শুরু করেছেন। এমনকি পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও বিবৃতি দিয়ে পুলিশের এ পোশাক পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকেও মতামত সংগ্রহ করছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ মতামত সরকারের কাছে উপস্থাপন করে পোশাকসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চাইবে পুলিশ।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন,‘পুলিশের পোশাক সরকার নির্ধারণ করে থাকে। এখানে কোনো অভিযোগ বা দাবি থাকলে সেটাও যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের কাছে উত্থাপিত হবে। পরবর্তী সময়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে ধরনের বৈশিষ্ট্য ও মানদণ্ড থাকা দরকার তা অনুসরণ করা হয়নি। পোশাকের বৈশিষ্ট্য ও রঙের বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া গেলে সমস্যার সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করি।’

সূত্র: বণিক বার্তা

সর্বশেষ