হা-মীম গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে উত্তেজনা, সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বহু পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এদিন হা-মীম গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীদেরও অবস্থান ও মিছিল করতে দেখা গেছে। এদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৩৩ সদস্যকে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬৭০ থেকে ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও সাভার-আশুলিয়া এলাকার ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান।
আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকালে নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তাঁরা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হয়ে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন।
একপর্যায়ে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদসহ পথচারী ও সাধারণ শ্রমিক মিলিয়ে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
আল-মুসলিমসহ কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। তাঁরা কারখানার ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাঁদের সরিয়ে দেয়। আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকাতেও স্কাইলাইন কারখানার সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা।
গাজীপুরের নলজানি, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, ভোগড়া, নাওজোর ও সাইনবোর্ড এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে নাওজোর এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ সময় শ্রমিকদের হামলায় সময় টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন আহত হন এবং তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য আহত হন।
রাজধানীর মিরপুরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে ধাওয়া দিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আগের দিনের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মিরপুরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় ১৩ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে এবং ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জেও শ্রমিকদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকেরা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পোশাকশ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে তাঁদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এরই মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের পরও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে মালিকপক্ষ ও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা কাটেনি।



























