রোববার ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:০৪, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি

ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

ই-টিন (e-TIN) নিবন্ধন থাকার পরও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা আরোপের সুযোগ থাকলেও এর পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ওপর। বিশেষ করে, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা ৫ হাজার টাকা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হতে পারে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অনেক করদাতার মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে বিষয়টি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। কারও ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ এক রকম হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে ভিন্ন হিসাব প্রযোজ্য হতে পারে।

রিটার্ন জমা না দিলে কত টাকা জরিমানা হতে পারে?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার আইনের বিধান অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করতে পারেন। অর্থাৎ, শুধু ই-টিন নিবন্ধন রয়েছে এবং রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি—এ তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার ওপর জরিমানা আরোপ করা হয় না।

আইনের ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ধারা ১৬৬, ১৭২, ১৯১, ১৯৩ বা ২১২-এর অধীন রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের সুযোগ রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করা করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন জরিমানা ১ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আগে আয় নিরূপণ হয়নি: আগে কখনো আয় নিরূপণ করা হয়নি, এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।

আগে আয় নিরূপণ হয়েছে: এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেটি সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা হিসেবে প্রযোজ্য।

অতএব, ৫ হাজার টাকা সবার জন্য নির্ধারিত জরিমানা নয়; এটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য সর্বোচ্চ সীমা। জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে করদাতার অবস্থা এবং আইনের সংশ্লিষ্ট শর্ত বিবেচনা করতে হয়।

শুধু ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দিতে হবে?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হয় আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে। তাই শুধু ই-টিন আছে কি না, কিংবা আয় করযোগ্য সীমার নিচে কি না—এ দুটি বিষয় বিবেচনা করেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছেন—

- যাদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
- যাদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আগের বছরগুলোর আয় নিরূপণ বা করযোগ্য আয়ের বিষয়টি প্রযোজ্য।
- ফার্মের অংশীদার।
- কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।
- সরকারি কর্মচারীসহ আইনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া অন্যান্য শ্রেণির ব্যক্তি।
- যাদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে হয়।

এ ছাড়া আয়কর আইনের অন্যান্য বিধানের আওতায়ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে।

ফলে আয় কমে যাওয়া কিংবা বর্তমানে আয়কর দিতে হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ সময় কখন?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। এ সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষে এনবিআর সময়সীমা বাড়ালে সেই বর্ধিত সময় কার্যকর হয়।

এর আগে ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সাধারণ সময়সীমা ৩০ নভেম্বর থাকলেও পরে তা কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা উচিত। দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর, সুদ কিংবা জরিমানা প্রযোজ্য হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। করদাতার পরিস্থিতিভেদে হিসাবেও পার্থক্য হতে পারে।

আয় করযোগ্য নয়, কিন্তু ই-টিন রয়েছে—করণীয় কী?

ব্যাংকিং সেবা, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে অনেকেই ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরবর্তী সময়ে কারও আয় কমে যেতে পারে, আবার কারও ই-টিন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আর নাও থাকতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ, আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।

প্রযোজ্য শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিষয়টি যাচাই করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।

এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, টিআইএন বাতিলের বিষয়টি এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক নয়। তাই নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী কর কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

অনলাইনে যেভাবে রিটার্ন জমার তথ্য যাচাই করবেন

ই-টিন নিবন্ধনের পর কোন কোন করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তা নিশ্চিত না হলে অনলাইনে নিজের কর-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করতে পারেন।

১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টাল **https://etaxnbr.gov.bd/**-এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

২. রিটার্ন দাখিলের রেকর্ড দেখুন

কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা দিয়েছেন, সেগুলোর তথ্য, প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।

৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন

যে করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে রিটার্ন দাখিল করুন। বিলম্বের কারণে কোনো অতিরিক্ত কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, সেটিও যাচাই করুন।

**৪. জরিমানার নোটিশ পেলে সংশ্লিষ্ট কর অফিসে যোগাযোগ করুন**

জরিমানার নোটিশ পেলে কোন করবর্ষে এবং কী কারণে তা আরোপ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত হন। প্রয়োজনে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিতে পারেন।

অনলাইনে রিটার্ন জমার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করার পাশাপাশি আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য নির্ভুলভাবে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর এবং উৎসে কর্তিত করের তথ্যও যাচাই করে নিতে হবে।

রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন হলে প্রাপ্তিস্বীকার ও সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি নিজের এনআইডি, টিআইএন, পাসওয়ার্ড কিংবা আর্থিক তথ্য অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২০২৬-২০২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু শ্রেণির করদাতা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

আতঙ্কিত না হয়ে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করুন

ই-টিন নিবন্ধন থাকার পরও আয়কর রিটার্ন জমা না দিয়ে থাকলে প্রথমেই নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫ হাজার টাকা জরিমানার তথ্য দেখে সবার আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ, ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করা হয়। তাই সবার জন্য একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না এবং বিলম্বের কারণে কোনো জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

জনপ্রিয়