রোববার ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেক্স

প্রকাশিত: ১৭:১৬, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি

চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। দুই বছর ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা, ইসরাইলের জন্য সামরিক সমর্থন এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সীমিত করার সুযোগ পাবেন।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দলীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে জয় পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। সিনেটেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক ব্যয়ের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করবেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকানরা ট্রাম্প প্রশাসনকে এসব বিষয়ে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হলে সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে দলটি।

ইরান যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। এরপর থেকে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করে একাধিকবার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

এ ধরনের একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থনেও পাস হয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করে।

নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, যুদ্ধের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে কংগ্রেসে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার উদ্যোগও নিতে পারেন তারা।

ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা

ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পুনরায় বাড়ানোও ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে। রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ইউক্রেনের জন্য সরাসরি মার্কিন সহায়তা ট্রাম্প প্রশাসন অনেকটাই বন্ধ রেখেছে। তবে এ বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একটি অংশেরও সমর্থন রয়েছে।

সম্প্রতি রুশ ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসের অনেক সদস্যের সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। আইন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই জয় পেলে ডেমোক্র্যাটরা কোন প্রস্তাবের ওপর কখন ভোট হবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা অনুমোদনের পথ তৈরি হতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সহায়তার প্রস্তাব ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনও পেতে পারে।

এ ছাড়া রুশ জ্বালানি পণ্যকে আবার বৈশ্বিক বাজারে ফিরিয়ে আনার ট্রাম্পের পরিকল্পনা ঠেকাতেও উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। এ বিষয়ে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস দ্বিদলীয় সমর্থন পাওয়া একটি আইন প্রস্তাব করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির নেতৃত্বও পেতে পারেন।

ইসরাইলের সামরিক সহায়তা কমানো বা বন্ধের উদ্যোগ

ইসরাইলের প্রতি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গাজা যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক এ অবস্থার অন্যতম কারণ।

এ পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা সীমিত করা কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। সর্বশেষ অর্থবছরে ইসরাইলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরাইলের জন্য সহায়তা বন্ধ করার একটি উদ্যোগের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

যারা ওই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ইসরাইলকে ভারী বোমার মতো নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা পেলে ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তার পরিমাণ ও ধরন—দুটিই পুনর্বিবেচনার মুখে পড়তে পারে।

প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানো ও বৈদেশিক সহায়তা পুনর্বহাল

ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনাও ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে এ উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং সামাজিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যয়সংকোচনের সিদ্ধান্তকে এর কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তারা।

একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদিত বৈদেশিক সহায়তার কয়েক শ কোটি ডলার আটকে রেখেছে বা বাতিল করেছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এসব অর্থ পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।

তবে নির্বাচনে জয় পেলেই ডেমোক্র্যাটরা সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে নতুন আইন পাস, অর্থ বরাদ্দ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাধা থেকেই যাবে।

সব মিলিয়ে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ওপর আইনপ্রণেতাদের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা, ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সূত্র: রয়টার্স

জনপ্রিয়