শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:২১, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্সে

চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্সে
ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা সম্প্রসারণের উদ্যোগে আরও শক্তিশালী ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে এমন ধারণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষক।

তাদের মতে, কারখানাটিতে বড় আকারের কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র আরও দূরে আঘাত হানতে পারবে অথবা বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম হবে।

এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবকে ইরানের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক সরঞ্জামের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এর বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির বিরোধিতাও বাড়তে পারে। প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তা করার বিষয়টি রয়েছে। তবে চুক্তিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগেই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উপগ্রহের ছবিতে কারখানা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উপগ্রহচিত্র প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রিয়াদের প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আল-দাওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কমপ্লেক্সের ছবি তুলেছে।

এসব ছবি বিশ্লেষণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডুইটসম্যান। তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেখানে নতুন একটি ভবন তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি প্রস্তুতের জন্য বিশেষ গর্ত বা কাস্টিং পিট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ধরনের গর্তে জ্বালানির বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণ ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিনের খোলের মধ্যে ঢেলে শক্ত করা হয়। নতুন ভবনটির পাশে বিস্ফোরণের ঝুঁকি থেকে আশপাশের স্থাপনা রক্ষার জন্য দেয়ালের মতো কাঠামোও দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, ভবনটি কারখানার বিদ্যমান কাস্টিং পিট রয়েছে বলে ধারণা করা স্থাপনাটির অন্তত দ্বিগুণ বড়।

এ ছাড়া সেখানে আরেকটি নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এটি জ্বালানির উপাদান অথবা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রস্তুত করা যন্ত্রাংশ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।

গবেষকেরা তাদের মূল্যায়নে লিখেছেন, উপগ্রহের ছবিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কমপ্লেক্সের অবকাঠামো সম্প্রসারণের ইঙ্গিত রয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্ভবত এমন বড় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা, যেগুলো বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে বা আরও দূরে আঘাত হানতে পারবে।

সামরিক বাহিনীগুলো সাধারণত কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রকে গুরুত্ব দেয়। কারণ, এগুলো দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় এবং তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।

চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এবং গবেষণা সংস্থা সিএনএর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের ধরন থেকে ধারণা করা যায়, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্সে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, কারখানাটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রেরও মিল রয়েছে।

১৯৮৭ সালে চীন থেকে গোপনে প্রায় ৪০টি তরল জ্বালানিচালিত ডিএফ-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল সৌদি আরব। ১৯৯১ সালে প্রকাশ করা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি গোপনীয়তা প্রত্যাহার করা মূল্যায়নে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের এপ্রিলে সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর দুটি প্রদর্শন করে সৌদি আরব।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে এফপিআরআইয়ের গবেষকেরা ইয়েমেনে সৌদি আরবের ছোড়া চীনা নকশার ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বলে ধারণা করা কিছু ছবিও শনাক্ত করেছেন।

গবেষক স্যাম লেয়ারের ধারণা, সৌদি আরব এখন নিজস্বভাবে কঠিন জ্বালানিচালিত ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে থাকতে পারে। আর আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের লক্ষ্য হতে পারে আরও দূরপাল্লার ডিএফ-২১ বা একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় সৌদি আরব চীনের দিকে ঝুঁকেছে বলে ধারণা করা হয়।

এ বিষয়ে সৌদি আরবের দূতাবাস ও তথ্য মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। চীনের দূতাবাস ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি। সিআইএ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে

আইআইএসএসের গবেষক সাশা ব্রুখমানের মতে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার মুখে মার্কিন সরবরাহ করা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ঝুঁকি ছাড়াই ইরানে হামলার সুযোগ দিতে পারে।

তিনি বলেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা থাকলে সৌদি আরবের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবে। বর্তমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। সৌদি আরবের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এই ব্যবধান কিছুটা কমাতে পারে।

রয়টার্সের অনুরোধে এফপিআরআইয়ের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে ব্রুখমানও মনে করেন, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য আরও শক্তিশালী কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন হতে পারে।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনসও বিশ্লেষণটি পর্যালোচনা করেছে। তাদের মতে, নতুন ভবনগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো অথবা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উন্নয়নকাজে সহায়তার উদ্যোগের ইঙ্গিত দিতে পারে।

সিএনএর বিশ্লেষক ডেকার ইভলেথও উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করে আল-দাওয়াদিমির নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে এফপিআরআইয়ের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।

ইভলেথ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কও নিজেদের আক্রমণাত্মক এবং প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে জটিলতা

সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তা করার বিষয়ে প্রস্তাবিত চুক্তির বিরোধিতা আরও জোরালো হতে পারে।

চুক্তিটির সমালোচকদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে সৌদি আরব গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। তবে সৌদি সরকার এমন কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।

বছরখানেক আগে শুরু নির্মাণকাজ

এফপিআরআইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। সে সময় সম্ভাব্য সংরক্ষণাগারের জন্য জমি পরিষ্কার ও খননকাজ চালানো হয়। একই মাসের শেষ দিকে অথবা মে মাসের শুরুতে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি প্রস্তুতের জন্য নতুন ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের একটি ছবিতে ভবনটির ভেতরে দুটি গভীর গর্ত দেখা যায় বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তখনো ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়নি। ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ছবিতেও ছাদের কিছু অংশ অসম্পূর্ণ ছিল। ভবনটির দুই পাশে বিস্ফোরণের চাপ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার উপযোগী শক্তিশালী দেয়াল দেখা যায়। গবেষকদের মতে, দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণে পাশের স্থাপনাগুলোর ক্ষতি কমানোর জন্য এসব দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার ছবিতেও এ ধরনের দেয়ালের মিল পাওয়া যায়। এটি নতুন ভবনটি কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন তৈরির কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে।

এফপিআরআইয়ের ধারণা, ভবনগুলোর ছাদ নির্মাণ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না। তবে জ্বালানি প্রস্তুতের যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে কয়েক মাস প্রয়োজন হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থাপনাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু হতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

সর্বশেষ

জনপ্রিয়