সোমবার ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০:১১, ৫ অক্টোবর ২০২৬

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি
ছবিঃ প্রতিনিধি

সময়ের পরিক্রমায় ঢেঁকি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিক রাইস ও ফ্লাওয়ার মিলের দাপটে গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের এই ঐতিহ্য। সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিছাঁটা চাল, লোকজ গান আর নবান্নের সেই প্রাণবন্ত স্মৃতিও।  চোখ বুঁজে একটু পেছনে ফিরে গেলে চোখে ভেসে উঠবে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ঢেঁকি রয়েছে।

প্রত্যেক ঘরে ধান ভানার মনোরম দৃশ্য চোখের সামনে চলে আসবে। কিন্তু এখন আর গ্রাম বাংলায় ঢেঁকিতে ধান ভানার দৃশ্য চোখে পড়ে না ও শোনা যায় না ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ । আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে দেশের প্রতিটা অঞ্চলে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টে গেছে। মাটির বাড়ির স্থলে উঠেছে ইটের বাড়ি। কুঁড়েঘরের স্থান নিয়েছে দালান। মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্যবহার হচ্ছে নানা রকম সব প্রযুক্তি।

একসময় ধান থেকে চাল তৈরির অন্যতম মাধ্যম ছিল ঢেঁকি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নতুন ধান ঘরে তোলার পর ঢেঁকিতে ধান ভানার ব্যস্ততা শুরু হতো। পরিবারের বউ-ঝিরা পালাক্রমে ঢেঁকিতে ধান ভানতেন। ঢেঁকির ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর গান। কাজের ক্লান্তিও যেন আনন্দের কাছে হার মানত।

নতুন ধানের মৌসুম মানেই ছিল নবান্নের আয়োজন। ঢেঁকিতে ধান ভেনে তৈরি করা হতো আটা ও চালের গুঁড়া। সেই গুঁড়া দিয়ে বানানো হতো নানা ধরনের পিঠা-পুলি। বাড়িতে বাড়িতে বসত পিঠা তৈরির ধুম। তৈরি হতো পায়েসসহ নানা মুখরোচক খাবার। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত বাড়ির আঙিনা।

একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকি থাকলেও এখন দু-একটি বাড়িতে পুরোনো ঢেঁকি চোখে পড়ে। সেগুলোর অধিকাংশই আর নিয়মিত ব্যবহার হয় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঢেঁকি দেখেছে শুধু গ্রামে, ছবিতে কিংবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণে।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পূর্ব জয়পুর গ্রামের শতবর্ষী দরবেশ মিয়া ও উপজেলার সিনিয়র সাংবাদিক খোঁজার গ্রামের সাজিদুর রহমান সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, নতুন ধান ঘরে ওঠার পর গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। ঢেঁকিতে ধান ভেনে নবান্নের আটা তৈরি করা হতো। এরপর শুরু হতো পিঠা-পায়েস তৈরির আয়োজন। পরিবারের সবাই এতে অংশ নিতেন। শিশু-কিশোররা নেচে-গেয়ে আনন্দ করত। সেই সময়ের পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দের সঙ্গে ঢেঁকি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

ধান ভানাকে শুধু গৃহস্থালির কাজ হিসেবে দেখা হতো না, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, লোকসংগীত ও গ্রামীণ সংস্কৃতি। এখন সেসব দৃশ্য অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

তবে ধান ভাঙাই নয়, ঢেঁকিতে চালের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার অনেক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রে দ্রুত ধান ভাঙানো সম্ভব হওয়ায় ঢেঁকির ব্যবহার কমেছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এখন রাইস মিল ও ফ্লাওয়ার মিলের বিস্তার ঘটেছে। ফলে ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরোনো ঢেঁকিগুলোও একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রবীণদের মতে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রা বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ ঢেঁকি শুধু ধান ভানার একটি কাঠের যন্ত্র নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার নারীদের শ্রম, পারিবারিক বন্ধন, লোকগান, নবান্ন এবং একসময়ের সরল-স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সময়ের সঙ্গে বাহুবল উপজেলার প্রায় সকল গ্রামেও বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন আর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেঁকির ‘ঠক ঠক’ শব্দ শোনা যায় না। নবান্নের সেই পিঠা তৈরির আয়োজনও নেই। দ্রুতগতির কাছে হার মেনেছে ঢেঁকির ধীর ছন্দ। ঢেঁকির ছন্দ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো বেঁচে আছে নবান্নের সেই দিন—ধান ভানার গান, উঠানের পিঠা-পায়েস আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠার সেই সোনালি সময়। ফলে সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি কালের বির্বতনে  আবহমান গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ।

জনপ্রিয়