দীর্ঘ দুই দশক পর রাজপথে হেঁটে শোভাযাত্রায় তারেক রহমান
দীর্ঘ দুই দশকের বিরতি। সময়ের ব্যবধানে বদলেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বদলেছে পরিচয় ও দায়িত্ব। ২০০৫ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় দলের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারেক রহমান। ২১ বছর পর আবারও রাজপথের শোভাযাত্রায় পা মেলালেন তিনি। তবে এবার তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান নন, দেশের প্রধানমন্ত্রীও।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শনিবার রাজধানীতে বিএনপির আয়োজিত সার্বভৌমত্ব র্যালিতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে হেঁটে অংশ নেন তারেক রহমান। দলীয় নেতাকর্মীদের স্লোগান, পতাকা, ব্যানার আর বাদ্যযন্ত্রের তালে বর্ণিল হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজপথ। র্যালির সামনের সারিতে থেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে পথ চলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে র্যালি শুরু হয়। এর আগে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট থেকে ৩টা ১০ মিনিট পর্যন্ত সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। পরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে র্যালিতে যোগ দেন তিনি।
সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ গড়া ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র কেড়ে নিয়ে বাকশাল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা আবার গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে এনেছিল এবং স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল।
তিনি বলেন, পরাজিত শক্তি আবার ষড়যন্ত্র করছে। যারা বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে পারেনি, তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে আসা ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোনো কিছুই দেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
৭ নভেম্বরের র্যালিকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মানুষের জীবন ও ত্যাগের বিনিময়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা রক্ষা করতে হবে। এজন্য দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নয়াপল্টন থেকে শুরু হওয়া র্যালিটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। নাইটিঙ্গেল মোড়, কাকরাইল, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে, হেয়ার রোড, মিন্টো রোড, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে র্যালি পৌঁছায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে সেখানে পৌঁছান তারেক রহমান ও র্যালিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা।
র্যালিতে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণ ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমানুল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার।
এছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু উপস্থিত ছিলেন।
র্যালিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা অংশ নেন। নারী-পুরুষ, তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে শোভাযাত্রায় দেখা যায় নানা বয়স ও শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ। কারও হাতে দলীয় পতাকা, কারও হাতে ব্যানার। ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। নানা রঙের পোশাক ও দলীয় পতাকার সমাবেশে র্যালিটি পায় বর্ণিল রূপ।
শোভাযাত্রায় ছিল রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের আয়োজনও। একটি খাঁচায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতীকী চরিত্রকে রাক্ষুসীর অবয়বে উপস্থাপন করা হয়। চরিত্রটির বড় দাঁত ছিল এবং খাঁচার গায়ে লেখা ছিল ‘আমি রক্ত পিপাসু’। অন্য একটি খাঁচায় প্রতীকীভাবে বন্দি অবস্থায় তুলে ধরা হয় সালমান এফ রহমান, হাসানুল হক ইনু, শাহজাহান খান ও জুনাইদ আহমেদ পলককে। ওই খাঁচার গায়ে লেখা ছিল ‘কেন্দ্রীয় কারাগার’।
২০০৫ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা থেকে ২০২৬ সালের সার্বভৌমত্ব র্যালি—দুই সময়ের ব্যবধান ২১ বছর। সেই সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়া তারেক রহমান এবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজপথে হাঁটলেন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচিতে তার এই অংশগ্রহণ র্যালির অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।



























