মিথ্যা আশ্বাসে অর্থনীতির সর্বনাশ করা এক গভর্নর
আহসান এইচ মনসুর। বাংলাদেশের সুশীল সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, আইএমএফের সাবেক পূর্ণকালীন কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক। এরকম একজন ব্যক্তিকে যখন জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তখন অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন।
অনেক আশায় বুক বেঁধেছিলাম এটা ভেবে যে এবার বুঝি বাংলাদেশের অর্থনীতি অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাবে। কিন্তু ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করল সবকিছু, যখন ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনীতি খাদের তলানির দিকে যেতে শুরু করল। মূল্যস্ফীতি চড়া, ১৮ মাসের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরও। ব্যবসা গুটিয়ে গেছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, প্রতি প্রান্তিকে বেড়েছে খেলাপি ঋণের হিসাব।
আমরা চেয়েছি সমাধান, আর বাংলাদেশ ব্যাংক দিনের পর দিন সমস্যার পাহাড় দেখিয়ে গেছে। তিনি শুধু মিথ্যা আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারেননি। আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই বললেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা তাঁর অগ্রাধিকার। ’
২৪-এর ডিসেম্বর ঘোষণা করলেন ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আসবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া কিছু টাকা। জনগণের টাকা খরচ করে টাকা উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এক বছর পর সুর পাল্টে গেল সুশীল গভর্নরের। বললেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে।
এর কম সময়ে তা সম্ভব নয়। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, এ বিষয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ১৮ মাসে এক টাকাও ফেরত আনতে পারেননি বিদায়ি গভর্নর, কিন্তু টাকা উদ্ধারের নামে খরচ করেছেন কোটি কোটি টাকা। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের জন্য দায়ী গভর্নরের বিচার করবে কে? শুধু অর্থ পাচার প্রসঙ্গে নয়, ১৮ মাসে আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে দেশের অর্থনীতিকে রীতিমতো পঙ্গু বানিয়ে ফেলেছেন সুশীল গভর্নর। অর্থনীতির আকাশে শুদ্ধির বজ্রধ্বনি তুলেছিলেন তিনি। পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাত আর শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম, অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। অন্তর্র্বর্তী সরকারের নির্দেশে দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলো ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি, বিদেশে অর্থ পাচার।
কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই দৃশ্যমান কোনো অর্থ পাচার বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। তদন্তের ঢাকঢোল যত জোরে পেটানো হয়েছিল, ফল ততটাই অনিশ্চিত থেকে গেছে। বরং এই সময়টায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয়ে গেছে ধীরে ধীরে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও অনিশ্চয়তার আবহে নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, পুঁজিবাজারে দেখা দেয় স্থবিরতা। এই পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংক খাত ডুবিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে বিদায় নিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তাঁর বিদায়ের পর সুশীল সমাজের যারা অর্থনীতি বোঝেন, তাঁরাও আহসান মনসুরের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
গভর্নরের বিদায়ের পর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, টাকা ছাপানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাঁর সংস্থা এটাকে কোনোভাবেই উৎসাহিত করে না। তিনি বলেন, ঘোষণা দিয়ে হোক বা গোপনে হোক, কোনোভাবেই টাকা ছাপানো ঠিক না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করেছেন টাকা না ছাপানোর জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপিয়ে তিনি সেটা গোপন রেখেছেন। পরে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থনীতি যে অবস্থায় পেয়েছিল, বর্তমান সরকার তার চেয়েও কিছুটা খারাপ অবস্থায় পেয়েছে। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।
‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেওয়া নানা পদক্ষেপের সমালোচনা করে এসব কথা বলেছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বিগত সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপেও গত দেড় বছরে তা খুব বেশি কমেনি। গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিন দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছেন। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি না কমে বরং ঋণের সুদহার বেড়ে সর্বোচ্চ ১৬-১৭ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যা বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজার কিন্তু বুঝতে পারে যে টাকা ছাপানো হয়েছে কি না। কারণ টাকার বিপরীতে যদি পণ্য উৎপাদন না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি হতে বাধ্য। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ যদি অন্যতম লক্ষ্য হয়, তাহলে টাকা ছাপানোর চিন্তা যেন স্বপ্নেও না আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে গলদ ছিল বলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘস্থায়ী সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি তথা ১০ শতাংশ নীতি সুদহার বজায় রাখলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, গত ডিসেম্বরে যার পরিমাণ ৬ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। নীতি সুদহারের প্রভাবে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের অকার্যকর মুদ্রানীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
শুধু তা-ই নয়, বিনিময় হার জোর করে ধরে রেখেছিলেন সাবেক গভর্নর। এর পরও রপ্তানি খাতে এই নীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গত ছয় মাসে রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমে সর্বশেষ ডিসেম্বরে ঋণাত্মক (-১৪.২৫) শতাংশে নেমে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে। এটা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
এমন বাস্তবতায় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর যে নীতিতে চলেছেন, তাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে নীতি সুদহার কমানোসহ একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব মুদ্রানীতি প্রত্যাশা করেন তিনি। যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ, নমনীয় তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে।’
সিপিডির মতে, ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে চারটি প্রধান খাতে নতুন সরকারকে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, সুদের হার কমানো। তৃতীয়ত, টাকার মূল্যমান কিছুটা কমানো এবং চতুর্থত, দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। যার সবগুলোই বাংলাদেশ ব্যাংককে করতে হবে। আহসান এইচ মনসুর যেটা করতে পারেননি বা করেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলছেন, আহসান মনসুর মূলত একজন আইএমএফের দালাল। ওরা যা বলছে, সাবেক গভর্নর তাই করেছেন। দেশ ও জনগণের কল্যাণ নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে বসে আইএমএফের স্বার্থ দেখেছেন। এতে দেশের অর্থনীতির বারোটা বেজেছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন এর সৌজন্যে



























