শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

সংবাদ পরিক্রমা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে কী বলেছিলেন তাহসিফ?

৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে কী বলেছিলেন তাহসিফ?
ছবিঃ সংগৃহীত

নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার একটি ভিডিও। ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কিংবা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ভিডিওটির কোনো যোগসূত্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তাহসিফ নিজেই। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কী, তা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত বলতে নিজের অপারগতার কথাও জানিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পডকাস্টের বক্তব্য এবং এক বন্ধুর ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।

পডকাস্টে কী বলেছিলেন তাহসিফ?

গত ২১ জুলাই ‘Speak With Rashid’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক পডকাস্টে নিজের চাকরি, বিমানবাহিনীতে কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন সম্পর্কে কথা বলেন তাহসিফ সাউরি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলোকে তিনি প্রোপাগান্ডা বলে অভিহিত করেন।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে উপস্থাপক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিওর প্রসঙ্গ তোলেন। ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা জানতে চান উপস্থাপক।

জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘ওখানে তারা ক্লিয়ারলি লিখেছে ভিডিওটি আমি ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও তারা বলেনি। বলেছে, রিফাত আশরাফী ভিডিওটা করেছে এবং আমি ভিডিওটা নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি, ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দ্য প্রুফ দে আর হ্যাভিং।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটাও হতে পারে, এজন্য (এই অভিযোগের জন্য) আমি হয়তো আজকে এয়ারফোর্সে নেই।’

পরে উপস্থাপক জানতে চান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই তাঁকে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল কি না।

জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘হতে পারে। যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে। আমার মনে হয়, এই অভিযোগের কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’

তাঁর বক্তব্যে ভিডিওটি ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে স্বীকার করা হয়নি। বরং তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছেন এবং ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন।

বন্ধুর ফেসবুক পোস্টে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দাবি

তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কেএসএম ইনতিসার ইনজামাম (KSM Intisaar Inzimam) ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল এবং ভিডিওটি প্রকাশের পর তাঁকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়েছিল।

পোস্টে ইনতিসার লেখেন, ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।’

তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া, মরদেহের হাতে কাদা থাকার বিষয় এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়েও পোস্টে প্রশ্ন তোলেন ইনতিসার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বিরোধ বা দুর্ঘটনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলে তিনি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে ধরে নেবেন।

তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা ও দাবি। মরদেহের হাতে কাদা থাকার তাৎপর্য কিংবা মৃত্যুর পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তদন্তের ফল বা আনুষ্ঠানিক তথ্য ওই পোস্টে উপস্থাপন করা হয়নি।

বন্ধুত্ব, আদর্শের অমিল ও চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ

পোস্টে তাহসিফের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথাও তুলে ধরেন ইনতিসার। তাঁর দাবি, আদমজী কলেজে তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময়ও তাঁদের পরিচয় অব্যাহত ছিল।

ইনতিসার লেখেন, তাঁদের জীবনদর্শনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সময় তাহসিফ তাঁর কথা চুপ করে শুনতেন।

তাঁর দাবি, ৫ আগস্টের ভিডিও প্রকাশের পর তাহসিফকে বিভিন্ন বিষয়ে হেয় করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা করা সম্ভব হয়নি বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন ইনতিসার। এসব ঘটনার সঙ্গে ভিডিও প্রকাশের যোগসূত্র রয়েছে বলে নিজের বিশ্বাসের কথা জানান তিনি।

তবে বন্ধুর এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। ভিডিও প্রকাশের কারণে তাহসিফ হয়রানির শিকার হয়েছিলেন কি না, কিংবা তাঁর চাকরি থেকে অব্যাহতির সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নির্ধারণে প্রামাণ্য তথ্য প্রয়োজন।

তুরাগ নদ থেকে যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর, গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। ২৯ অক্টোবর পুলিশ তাঁর পরিচয় ও মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করে।

নৌপুলিশ সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল ছাড়া মৃত্যুর ধরন কিংবা এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

তাহসিফ সাউরির পডকাস্টের বক্তব্য, তাঁর বন্ধুর ফেসবুক পোস্ট এবং মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি—সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।

তবে তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি: ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, কে সেটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না। একটি বিষয়ে প্রচলিত দাবি অন্য বিষয়গুলোর সত্যতা প্রমাণ করে না।

পডকাস্টে তাহসিফ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং কিছু ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এলেও, তিনি ঠিক কোন ঘটনাগুলোর কথা বলতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর মৃত্যুর কারণ কী, নিখোঁজ হওয়ার আগে কী ঘটেছিল এবং ভিডিওসংক্রান্ত অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে বের করা। তার আগে মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা ভিডিও প্রকাশের যোগসূত্রকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়